Tag Archive | সভা

নেতা (3/3)

(আগের পৃষ্ঠা)

এভাবে প্রথম দিন কেটে গেল এবং একই রকম সাফল্য অর্জন করতে করতে আরও অনেক দিন কাটল। খুব তাত্পর্যপূর্ণ কিছুই ঘটেনি, কেবল তুচ্ছ ঘটনা: “তার মুখ-থুবড়ে একবার খাদে পরে যায়, তারপর একটি গিরিসংকটে; তারপর ব্ল্যাকবেরির ঝোপে ঘষা লাগে; কাঁটায় পা দেন; অনেকের হাত পা ভাঙ্গে; অনেকে মাথায় আঘাত লাগে। কিন্তু এই সমস্ত যন্ত্রণা তারা সহ্য করে নিয়েছিল। কয়েকজন বৃদ্ধকে রাস্তায় মড়ার জন্য ফেলে যেতে হয়েছিল। „তাদের বাড়িতে রেখে আসলেও তারা মারা যেতো, রাস্তায় না হলেও!” মুখপাত্র বলেছেন, অন্যদের পথ কলতে উৎসাহিত করার জন্য। এক থেকে দুই বছর বয়সী কয়েকটি ছোট বাচ্চাও মারা গেল। পিতা-মাতা উদ্বেগহীনভাবে নিজেদের ব্যথা দমন করেছিলেন কারণ এটিই ঈশ্বরের ইচ্ছা। “আর বাচ্চাদের বয়স যত কম তাদের দুঃখ তত কম। যখন তাদের বয়স কম থাকে তাদের দুঃখও কম হয়। ঈশ্বরের ইচ্ছা অনুসারে বিবাহের বয়সে পৌঁছে গেলে সন্তানের যেন মৃত্যু না হয়।সন্তানদের যদি মরতেই হয় তবে কম বয়সে মরা ভালো। তাহলে দুঃখ এত বেশি হয় না!” মুখপাত্ররা তাদের আবার সান্ত্বনা দিয়ে বলেন। কেউ কেউ মাথায় কাপড় জড়িয়ে রাখেন এবং মাথায় ঠান্ডা জিনিস চাপান। অন্যরা হাতে পট্টি বেঁধে চলেন। সবাই ক্লান্ত ও আহত ছিলেন। তাদের জামা কাপড় জরাজীর্ণ, কিন্তু তারা খুশি হয়ে এগিয়ে চলতে থাকে। এগুলি সহ্য করা আরও সহজ হত যদি ক্ষুধার্ত না হতেন। তা সত্তেও তাদের পথ চলা চালিয়ে যেতে হবে।

একদিন, আরও উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটে।

নেতা সবার সামনে হেঁটে যাচ্ছিলেন, দলের সাহসী লোকেরা তাকে চারিদিক থেকে ঘিরে রেখেছিল। (তাদের মধ্যে দু’জন নিখোঁজ ছিল কিন্তু কেউ জানত না তারা কোথায় ছিল। সবার ধারণা ছিল তারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছে এবং পালিয়ে গেছে। একসময় মুখপাত্র তাদের লজ্জাজনক বিশ্বাসঘাতকতা সম্পর্কে কিছু বলেছিলেন। মাত্র কয়েকজন বিশ্বাস করেছিলেন যে পথে ওই দু’জন মারা গিয়েছিলেন, কিন্তু তারা অন্যদের উদ্বিগ্ন করতে চাননি তাই তারা নিজদের মতামত কাউকে জানানি।) দলের বাকিরা তাঁর পিছনে সারি বোধ্য করে ছিল। হঠাৎ দেখা গেল এক বিশাল বড় এবং গভীর, পাথুরে খাদ। ঢাল এত খাড়া ছিল যে কারুর এক পা সামনে এগোনোর সাহস হচ্ছিল না। এমনকি সব থেকে সাহসী ব্যক্তিরাও থামে গিয়ে নেতার দিকে তাকালেন। মাথা নীচু করে চিন্তায় মগ্ন হয়ে তিনি সাহস করে সামনে এগিয়ে গেলেন, তার বেতটি সামনে ঠুকতে ঠুকতে প্রথমে ডানদিকে, তারপর বাম দিকে, তার সভাব বৈশিষ্ট অনুসারে। অনেকে বলেছিলেন যে তিনি যখন এই রকম করেন তখন থাকে দেখে খুব অভিজাত মনে হয়। তিনি কারুর দিকে তাকান না কিছু বলেন না। তিনি যখন কিনারের দিকে এগিয়ে যাচ্চিলেন তখনও তাঁর মুখের অভিব্যক্তির কোনও পরিবর্তন বা ভয়ের চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায়নি। খুব সাহসী লোকেদের ও মুখে রক্ত শূন্য হয় গেছিল, কিন্তু নেতা কে সাবধান করার সহস কারুর ছিল না। কিনারে পৌঁছাতে আর মাত্র দুটি ধাপ বাকি ছিল। আতঙ্কে এবং চোখ খোলা রেখে তারা সকলে ভয় কাঁপতে থাকে। সাহসী লোকেরা শৃংখলা লঙ্ঘন করে প্রায়ে নেতা কে আঁকাতে যাচ্ছিল কিন্তু তখনই নেতা দুই ধাপ এগিয়ে গিয়ে খাদে ঝাঁপিয়ে পরেন। উদ্বেগ, হাহাকার, চিৎকার করে উঠে সবাই; ভয়ের জিত হয়। অনেকে পালাতে শুরু করেন।

– দাঁড়াও ভাইয়েরা! তাড়া কিসের? আপনারা কি এইভাবে কথা রাখেন? আমাদের অবশ্যই এই জ্ঞানী ব্যক্তিটি কে অনুসরণ করতে হবে কারণ তিনি জানেন তিনি কি করছেন। তিনি নিজেকে শেষ করে ফেলার মত উন্মাদ নন। আগে এগিয়ে যাওয়া যাক তার পিছনে পিছনে! এটিই সবচেয়ে বড় এবং সম্ভবত সর্বশেষ বিপত্তি, শেষ বাধা। কে জানে? সম্ভবত এই উপত্যকার অপর পারে আমরা একটি দুর্দান্ত, উর্বর জমি পাব যা ঈশ্বর আমাদের জন্য ঠিক করে রেখেছেন। এগিয়ে যাওয়া যাক! ত্যাগ ছাড়া আমরা কিছুই পাব না! – এগুলি ছিল মুখপাত্রের পরামর্শের বাণী এবং তিনিও উপত্যকার দিকে দুই ধাপ এগিয়ে গিয়ে অদৃশ্য হয় যান। সাহসীরা তাকে অনুসরণ করেন এবং তারপরে সবাই ঝাঁপিয়ে পরে।

সবাই চিৎকার-চেঁচামেচি, কান্নাকাটি করতে শুরু করে নিচে গড়িয়ে পড়তে পড়তে। যে কেউ শপথ করে বলতে পারে ওখান থেকে কারুর বেঁচে ফিরে আসর সম্ভাবনা ছিলনা। কিন্তু নেতা অস্বাভাবিকভাবে ভাগ্যবান ছিলেন। তিনি পড়ে যেতে যেতে একটি ঝোপ ধরে ঝুলে পরেন তাই তার বেশি আঘাত লাগেনা। তিনি নিজেই কষ্ট করে ধরে ধরে উঠে আসতে পারেন। খাদের নিচে যখন কান্নাকাটি, বিলাপ, চিৎকার-চেঁচামেচি চলছিল তিনি নিশব্দে ওপরে বসে ছিলেন। আহত এবং ক্রুদ্ধ কয়েকজন তাকে অভিশাপ দিতে শুরু করলেও তিনি কোনো ভ্রূক্ষেপ করেন না। ভাগ্যক্রমে যারা পড়ে যাওয়ার সময় ঝোপ বা গাছ ধরে রাখতে পেরেছিলেন তারা ওপরে উঠতে শুরু করে খাদ থেকে বেরোনোর জন্য। কারও কারও মাথা ফেটে গিয়েছিল বলে মুখ বেয়ে রক্ত ঝরছিল। নেতা ছাড়া বাকি সবার অঘাত লেগেছিল। তারা সকলেই হঠাৎ তাকে দেখে বিরক্তি প্রকাশ করে এবং যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকেন কিন্তু নেতা মাথা তোলেন না। তিনি নীরব থাকন একজন চিন্তাভাবনা রত সাধুর মত!

কিছু সময় কেটে গেল। যাত্রীর সংখ্যা দিনে দিনে কমতে থাকে। কেউ কেউ দল ছেড়ে আবার ফিরে যায়।

অত বড় দলটির মাত্র কুড়ি জন রয়ে যায়। তাদের ক্লান্ত মুখগুলোতে হতাশা, সন্দেহ, অবসন্নতা এবং ক্ষুধার লক্ষণ ফুটে উঠেছিল কিন্তু কেউ একটা কোথাও বলে না। তারা তাদের নেতার মতোই চুপচাপ হয়ে সামনে হেঁটে যাচ্ছিল। এমনকি উৎসাহী মুখপাত্র মরিয়া হয়ে মাথা নাড়াতে থাকেন। রাস্তা খুবই কঠিন ছিল।

দিন দিন তাদের সংখ্যা কম হতে থাকে শেষ পর্যন্ত মাত্র দশজন বাকি থেকে যায়। হতাশ মুখগুলি নিয়ে, তারা কেবল কথো না বলে হাহাকার এবং অভিযোগ করতে থাকে।

তাদের দেখে পঙ্গু মনে হয়। কেউ কেউ ক্রাচে ভোর দিয়ে ছিল। তাদের মধ্যে কিছু জন ঘাড়ের সাথে বাঁধা হাতের বন্ধনের ওপর ভোর দিয়ে হাঁটছিল। এবং তাদের হাতে আরো অনেক ব্যান্ডেজ ছিল। এমনকি যদি তারা নতুন ত্যাগ স্বীকার করতে চাইত, তারা করতে পারত না কারণ তাদের দেহে কোনও নতুন ক্ষতের জন্য প্রায় কোনও খালি জায়গায় ছিল না।

এমনকি তাদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী এবং সাহসীরা ও ইতিমধ্যে বিশ্বাস এবং আশা হারিয়ে ফেলেছিল তবে তারা লড়াই করে যাচ্ছিল; মানে তারা কোনো রকমে খুড়িয়ে খুড়িয়ে হাঁটছিল অভিযোগ করতে করতে, অনেক ব্যথা সহ্য করে। ফিরে যেতে না পারলে আর কি বা করার ছিল? এত ত্যাগ করেও এখন কি যাত্রা ছেড়ে চলে যাওয়া যায়?

গোধূলি হয়। ক্রাচে ভর করে খোড়াতে খোড়াতে তারা হঠাৎ দেখতে পেল যে নেতা আর তাদের সামনে নেই। আর একটি পদক্ষেপ নিতে তারা দেখল তারা আবার কোনো খাদে পড়ে যাচ্ছে।

– ওহ, আমার পা! ওহ, আমার হাত! – কান্নার রোল ওঠে। এমনকি একটি দুর্বল কণ্ঠ যোগ্য নেতাকে অভিশাপ দেয় কিন্তু তারপরেই চুপ হয় যায়।

যখন সূর্য উঠল, সেখানে নেতা বসে ছিলেন, যেদিন তাকে বেছে নেওয়া হয়ছিল সেদিনের মত। তাঁর চেহারায় কিছু পরিবর্তন হয়নি।

মুখপাত্র খাদ থেকে উপরে উঠে আসে, তার পিছনে আরও দুজন। আহত এবং রক্তাক্ত, আর কত জন বেঁচে আছে আছে দেখার জন্য তারা পেছন ফেরে, কিন্তু শুধু তারাই বেঁচে ছিল। তাদের হৃদয় হতাশা এবং ভয় ভরে ওঠে। অঞ্চলটি অজানা, পাহাড়ি, পাথুরে – কোথাও কোনও পথ ছিল না। দুদিন আগ তারা একটি রাস্তা দেখতে পেরেছিল কিন্ত তারা সেটি ছেড়ে আসে। নেতা তাদের এই পথে নিয়ে আসে।

তারা এই দুর্দান্ত ভ্রমণে মারা যাওয়া অনেক বন্ধুবান্ধব এবং আত্মীয়স্বজন সম্পর্কে ভেবেছিল। তাদের পঙ্গু অঙ্গগুলির ব্যথার চেয়ে শক্তিশালী এক দুঃখ তাদেরকে পরাভূত করে। তারা নিজের চোখে নিজের ধ্বংস দেখেছে।

মুখপাত্র নেতার কাছে গেলেন এবং ব্যথা, হতাশা এবং ভীত কণ্ঠে কথা বলতে শুরু করলেন।

– আমরা এখন কোথায় যাচ্ছি?

নেতা নিরব ছিলেন।

– আপনি আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন এবং কোথায় নিয়ে এসেছেন? আমরা নিজেদের এবং আমাদের পরিবারগুলিকে আপনার হাতে তুলে দিয়েছিলাম এবং আমরা আপনাকে অনুসরণ করেছি আমাদের বাড়ি এবং পূর্বপুরুষদের কবর পিছনে ফেলে রেখে এই আশায় যে আমরা সেই অনুর্বর ভূমিতে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচতে পারব। কিন্তু আপনি আমাদের আরও খারাপভাবে ধ্বংস করেছেন। আপনার পিছনে দু’শ পরিবার ছিল এবং এখন দেখুন কতজন আছে!

– আপনার মানে সবাই এখানে নেই? – নেতা মাথা না তুলে নিচু গলায় বলেন।

– আপনি কিভাবে এই ধরনের প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে পারেন? তাকিয়ে দেখুন! দুর্ভাগ্যজনক এই যাত্রায় আমাদের মধ্যে কত জন রয়ে গেছে তা গণনা করুন! দেখুন আমাদের কি অবস্থা! এভাবে পঙ্গু হওয়ার চেয়ে মরে যাওয়া ভাল ছিল।

– আমি আপনাদের দেখতে পাব না!

– কেন?

– আমি অন্ধ।

সম্পূর্ণ নিরবতা।

– ভ্রমণের সময় আপনি কি আপনার দৃষ্টি হারিয়েছেন?

– আমি জন্ম অন্ধ!

তিনজন হতাশায় মাথা নিচু করে।

শরৎ কালের বাতাস পাহাড়ের মধ্য দিয়ে একটি শুকনো পাতা উড়িয়ে নিয়ে আসে। কুয়াশা পাহাড় ঢেকে ফেলে, ঠাণ্ডা, ভিজে হওয়ায় একটি কাক উড়তে থাকে। একটি অশুভ শঙ্কেতে চারিদিক ভরে ওঠে। সূর্য মেঘের আড়ালে লুকিয়ে ছিল, যা আরও দূরে এবং দ্রুত বয়ে যাচ্ছিল।

তিনজন একে অপরের দিকে ভীতির সাথে তাকায়।

– আমরা এখন কোথায় যাব? – একজন হতাশ স্বরে বলেন।

– আমরা জানি না!

 

বেলগ্রেডে, 1901।
রাদ্বয়ে ডোমানোভিচ” প্রকল্পটির জন্য অনুবাদ করেছেন মৈত্রেয়ী মন্ডল, 2020।

নেতা (2/3)

(আগের পৃষ্ঠা)

পরদিন যে দীর্ঘ যাত্রা করার সাহস যাদের ছিল তারা সবাই একত্রিত হয়। দুই শতাধিক পরিবার নিযুক্ত স্থানে আসেন। পুরাতন বাস ভূমি দেখাশোনা করার জন্য কেবল কয়েকজন রয়ে যায়।

এই দুর্দশাগ্রস্ত মানুষদের দুর্ভাগ্যের কারণে বাধ্য হয়ে নিজেদের জন্মস্থান, যেখানে তাদের পূর্বপুরুষদের কবর দেওয়া হয়ছে সেই জায়েগা ছেড়ে যেতে দেখা সত্যই দুঃখের বিষয় ছিল। তাদের মুখগুলি ক্লান্ত, জরাজীর্ণ এবং রোদে পোড়া ছিল। দীর্ঘ বহু বছরের কঠোর পরিশ্রমের প্রভাব তাদের চেহারায় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল, তাদের চেহারায় শুধুই ক্লান্তি ও হতাশা দেখা যাচ্ছিল। তবে এই মুহুর্তে আশার প্রথম ঝলক দেখা গিয়েছিল – তবে অবশ্যই তার সাথে মিশে ছিল বাড়ি ছাড়ার বিষন্নতা। অনেক বৃদ্ধের চোখ দিয়ে জল ঝড়ছিল, তাঁরা নিরাশা হয় দীর্ঘশ্বাস ফেলছিলেন এবং আরো দুর্ভোগের আশংকায় মাথা নাড়ছিলেন। তাঁর ইচ্ছা ছিল আর কিছু দিন থেকে যাওয়ার যাতে তিনিও এই পাথরের মধ্যে দেহ ত্যাগ করতে পারেন আরও ভালো বাস ভূমি সন্ধান করার পরিবর্তে। অনেক মহিলা উচ্চস্বরে শোক প্রকাশ করে নিজেদের পরিজনদের বিদায় জানালেন যাদের কবর তারা পিছনে ফেলে যাচ্ছে।

পরুষের দেখাতে চাইছিল তারা খুব সাহসী তাই তারা চিৎকার করছিল, – আচ্ছা, তাদলে কি আপনারা এই খারাপ জায়াগায় ঝুপড়িতে বাস করা অনাহারে দিন কাটাতে চান? – প্রকৃতপক্ষে যদি সম্ভব হত তবে তারা নিজেদের সাথ ইচ্ছা ছিল পুরো অঞ্চলটা নিজেদের সাথে নিয়ে যায়।

সাধারণত মানুষের ভিড়ে যেমন আওয়াজ হয় সেই রকম আয়জায় ও চিৎকার শোনা যাচ্ছিল। নারী পুরুষ সবাই অস্থির ছিল। বাচ্চারা তাদের মায়ের কোলে চেচামেচি করছিল। এমনকি পশুরাও কিছুটা অস্বস্তিতে ছিল। বেশি গরু ছিলনা, এদিক ওদিকে একটা দুটো হাড় জীর্ণ বাছুরও ছিল, এবং ছিল একটা বড় মাথা মোটা পা কিন্তু রোগা শরীর ঘোড়া, পিঠে তার পুরনো কম্বল, ব্যাগ আর জিনের উপর দুটো ভর্তি বস্তা, ওজনের চাপে বেচারা জন্তুটি দুলছিল। তুবও সেটা কোনো ভাবে দাঁড়িয়ে থাকে এবং মাঝে মাঝে ডাক ছারে। অন্যরা গাধার পিঠে জিনিস রাখছিল; এবং বাছারা কুকুরের গলার দড়ি ধরে টানছিল। কথা বলা, চিৎকার, চেঁচামেচি, গালাগালি, কান্না, কুকুরের ডাক, ঘোড়ার ডাক – সব কিছুই একটু বেশি মাত্রায় হচ্ছিল। এমন কি একটা গাধাও কয়েক বার ডেকে ওঠে। কিন্তু নেতা একটা কোথাও বলে না, যেন পুরো ব্যাপারটার সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই। একজন সত্যিকারের জ্ঞানী ব্যক্তি!

তিনি কেবল মাথা নিচু করে নিরবে বসে থাকেন। কখনো কখনো থুথু ফেলেন, আর কিছু না। কিন্তু তাঁর এই অদ্ভূত আচরণের কারণে তাঁর জনপ্রিয়তা এতটাই বেড়েছিল যে তাঁর আজ্ঞা অনুসারে সবাই আগুনে বা জলে ঝাঁপ দিতেও রাজি ছিল, যেমন তারা বলেছিল।

– এমন কাউকে খুঁজে পেয়ে আমাদের খুশি হওয়া উচিত। ঈশ্বর জানেন কি হত যদি আমরা তাঁকে সাথে না নিতাম! আমরা মারা পরতাম। আমি আপনাকে বলছ এনি সত্যিকারার বুদ্ধিমান! তিনি চুপ করে আছেন। তিনি এখনও পর্যন্ত একটি কোথাও বলেননি! – একজন শ্রদ্ধা ও গর্বের সাথে জেতার দিকে তাকিয়ে বলে।

– তিনি কি বলবেন? যারা বেশি কথা বলেন তারা খুব বেশি চিন্তা করেন না। উনি নিশ্চই খুব বুদ্ধিমান! তিনি কেবল চিন্তা-ভাবনা করেন এবং কিছুই বলেন না – আরো একজন বলেন, এবং তিনিও বিস্ময়ের সাথে নেতার দিকে তাকান।

– এত লোকের নেতৃত্ব করা সহজ নয়!  তাঁকে অনেক চিন্তাভাবনা করতে হবে কারণ তিনি অনেক বড় দায়িত্ব নিয়েছেন, – প্রথম ব্যক্তি অবার বলেন।

যাত্রা শুরু করার সময় হয়। তারা সবই কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেন, দেখার জন্য আর কেউ মত পাল্টে তাদের সাথে যেতে রাজি আছে কিনা, আর কেউ আসে না তাই আর তাদের সেখানে অপেক্ষা করা চলে না।

– আমাদের কি যাওয়া উচিত নয়? – তারা নেতা কে জিজ্ঞাসা করে।

নেতা কোনো কথা না বলে ওঠে দাঁড়ায়।

বিপদ বা জরুরী পরিস্থিতিতে নেতার পাশে থাকার জন্য সবচেয়ে সাহসী পুরুষরা নেতার চারপাশে দলবদ্ধ হয়।

নেতা, চেহারায় বিরক্তি নিয়ে, মাথা নিচু করে কয়েক ধাপ হাঁটেন সম্মানজনকভাবে নিজের সামনে নিজের বেত দোলাতে দোলাতে। সমাবেশটি তার পিছনে পিছনে চলতে থাকে এবং একাধিকবার চেঁচিয়ে ওঠে, “আমাদের নেতা দীর্ঘ জীবী হোক!” তিনি আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে গ্রামের হল ঘরের সামনের বেড়াতে ধাক্কা খান। সেখানে স্বাভাবিকভাবেই তিনি থামলেন; সুতরাং দলটিও থেকে যায়। তারপর নেতা খানিকটা পিছনে গিয়ে বেড়ার ওপর নিজের লাঠি দিয়ে কয়েকবার আঘাত করেন।

– আপনি আমাদের কি করতে আজ্ঞা করেন? – তারা জিজ্ঞাসা করে।

তিনি কিছুই বললেন না।

– আমাদের কি করা উচিৎ? বেড়া ভেঙে ফেলো! আমাদের এটাই করা উচিত! দেখতে পাচ্ছেন না উনি নিজের লাঠি দিয়ে আমাদের সেই রকমই নির্দেশ দিচ্ছেন? – যারা নেতার চারপাশে দাঁড়িয়েছিল তারা চিৎকার করে বলে উঠে।

– ঐ যে ফটক! ঐ যে ফটক! – বাচ্চারা চিৎকার করে তাদের অল্ট দিকের ফটকের দিকে আঙুল তুলে দেখায়।

– চুপ কর, বাচ্চারা!

– ঈশ্বর আমাদের সাহায্য করুন, কি যে হচ্ছে? – কয়েক জন মহিলা চিন্তিত হয় বলেন।

– কেউ কিছু বলবেন না! উনি জানেন আমাদের কি করা উচিত! বেড়া ভেঙে ফেলা হোক!

এক মুহুর্তে বেড়া ভেঙে ফেলা হল যেন সেখানে কখনও কোনো বেড়া ছিলই না।

তারা বেড়া ছাড়িয়ে এগিয়ে যায়।

বড়জোর তারা একশো ধাপ এগিয়ে ছিল নেতা একটা কাঁটা ঝোপে ধাক্কা খেয়ে থেমে যান। অনেক চেষ্ট করে তিনি ঝোপ থেকে বেরিয়ে আসেন ও নিজের লাঠি দিয়ে নিজের চারপাশের মাঠি ঠুকতে শুরুর করেন। কেউ এগিয়ে যায় না।

– এবার কি হল? – পিছনে যারা ছিল তারা চিৎকার করে জিজ্ঞাসা করে।

– কাঁটা ঝোপ কেটে ফেলো! – নেতার চারপাশে যারা দাঁড়িয়ে ছিল তারা বলে ওঠে।

– ওই যে রাস্তা, ঝোপের পিছনে! ওই কে দেখা যাচ্ছে! – বাচ্চারা এবং পিছন দিকে অনেক লোক চিৎকার করে ওঠে।

– ওই যে রাস্তা! ওই যে রাস্তা! – নেতার আশেপাশের লোকের ঠাট্টা-বিদ্রূপের স্বরে বলে ওঠে। – আমরা অন্ধ লোকেরে কিভাবে জানবো উনি আমাদের পথ দেখিয়ে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন? সবাই আজ্ঞা দিতে পারে না। নেতা সবচেয়ে ভাল এবং সোজা রাস্তা চেনেন। কাঁটা ঝোপ কেটে ফেলো!

সবাই রাস্তা পরিস্কার করতে ঝাঁপিয়ে পরে।

– আহ, -যার হাতে কাঁটা ফুটেছিল সে চেঁচিয়ে ওঠে তার সাথে যার মুখে ব্ল্যাকবেরি ডালের কাঁটা ফোটে সেও কঁকিয়ে ওঠে।

– ভাইয়েরা, তোমরা কিছু না হারিয়ে কিছু পেতে পারনা। সাফল্য অর্জনের জন্য তোমাদের কষ্ট করতে হবে, – উত্তর দেয় দলের সব থেকে সাহসী ব্যক্তি।

তারা অনেক কষ্টে ঝোপ ভেঙে এগিয়ে চলে।

আরও কিছুদূর ঘোরাফেরা করার পরে, তারা একগুচ্ছ লগির সাথে সাথে ধাক্কা খায়। এগুলোকে ও সরানো হয়। তারপর তারা অবার পথ চলতে থাকে।

প্রথম দিন খুব সামান্য পথ চলা হয় কারণ তাদের অনেকগুলি একই রকম বাধা অতিক্রম করতে হয়। তাদের খাছে খাবার সল্প পরিমাণে ছিল কারণ কিছি লোক সঙ্গে শুধু কিছু শুকনো রুটি আর চিজ এনেছিল, অন্যদের কাছে শুধুই সামান্য রুটি ছিল। কিছুই লোকের কাছে কোনো খাবারই ছিল না। ভাগ্যক্রমে গ্রীষ্মের সময় ছিল তাই তারা এখানে সেখানে একটা দুটো ফলের গাছ পেয়েছিল।

সুতরাং, যদিও প্রথম দিনে তারা খুবই কম দুরুত্ব পিছনে ছেড়ে আসতে পেরেছিল তবুও তারা তারা খুব ক্লান্ত বোধ করেছিল। কোনও বড় বিপদ বা  কোনও দুর্ঘটনাও ঘটেনি। স্বাভাবিকভাবেই এত বড় একটি উদ্যোগের ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত ঘটনাগুলিকে অবশ্যই সামান্য হিসাবে বিবেচনা করা উচিত: একজন মহিলার চোখে কাঁটা ফুটে যায়, তিনি সেটা এন্টি ভিজে কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখানে; একটি বাচ্চা কাঁদতে কাঁদতে লগির সাথে ধাক্কা খায়; একজন বয়স্ক ভদ্রলোকের পা মচকে যায় ব্ল্যাকবেরি ঝোপের উপর পরে গিয়ে; ব্যথার জায়গায় পিয়াজ লাগানোর পরে কোনো রকমে ব্যাথা সহ্য করে লাঠির ওপর ভোর করে হাঁটতে থাকেন বীরের মত নেতার পিছনে পিছনে। (নিশ্চিতভাবেই, বেশ কয়েকজন বলেছিলেন যে বয়স্ক লোকটি গোড়ালি সম্পর্কে মিথ্যা কথা বলছিল এবং তিনি কেবল ভান করছিলেন কারণ তিনি ফিরে যেতে ব্যাকুল ছিলেন।) শীঘ্রই, খুব কম লোকই ছিল যাদের হাতে কাঁটা ফুটে যায়নি অথবা মুখে আঁচর লাগেনি। পুরুষরা সমস্ত বীরত্বপূর্ণভাবে সহ্য করেছিল, কিন্তু মহিলারা যাত্রা শুরুর সময়টা কে অভিশাপ দিচ্ছিল এবং শিশুরা স্বাভাবিকভাবেই চিৎকার করে কান্নাকাটি করছিল কারণ তারা বুঝতে পারছিল না এই সমস্ত পরিশ্রমের পরিণাম সুখের হবে।

সবাই খুশি এবং আনন্দিত ছিল যে নেতার কিছুই ঘটেনি। সত্য কথা বলতে গেলে, তাঁকে অনেক সুরক্ষায় রাখা হয়ছিল কিন্তু তবুও লোকটি ভাগ্যবান ছিল। প্রথম রাতের শিবিরের জায়গাতে সকলেই ঈশ্বরের প্রার্থনা করেন এবং তাঁকে ধন্যবাদ জানায়, যে সে দিনের যাত্রা সফল হয়ছে এবং নেতার কোনো ক্ষতি হয়নি। তারপরে একজন সাহসী ব্যক্তি কথা বলতে শুরু করে। তার মুখে ব্ল্যাকবেরি ঝোপের আঁচর লেগেছিল। কিন্তু সেদিকে তার কোনো খেয়াল ছিল না।

– ভাইয়েরা, – তিনি বলতে শুরু করেন। – প্রথম দিনের যাত্রা আমরা পিছনে ফেলে এসেছি তাই আমাদের ঈশ্বর কে ধন্যবাদ জানানো উচিত। পথ সহজ নয়, তবুও আমাদের চলতে হবে কারণ আমরা সবাই জানি যে এই কঠিন রাস্তাটি আমাদের সুখের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সর্বশক্তিমান ঈশ্বর আমাদের নেতা কে যে কোনো রকম ক্ষতি থেকে রক্ষা করুন যাতে তিনি আমাদের সফলভাবে নেতৃত্ব দিয়ে যেতে পারেন।

– আজকের মতো ঘটনা ঘটলে কাল আমি আমার অন্য চোখটাও হারাব! – একজন মহিলা ক্রোধের সাথে বললেন।

– ওহ, আমার পা! – মহিলার মন্তব্যের দ্বারা উৎসাহিত হয় একজন বয়স্ক লোক বলেন।

শিশুরা কেঁদে চলে, যাতে মুখপাত্রের কথা শোনা যায় তাই বাচ্চাদের চুপ করাতে মায়েদের অনেক কষ্ট করতে হয়।

– হ্যাঁ, আপনি আপনার অন্য চোখটি হারাবেন – তিনি ক্রোধে ফেটে পরে বলেন – এবং আপনি দুটোই হারাতে পারেন! এত বড় উদ্যোগের জন্য একজন জন মহিলার চোখ হারানো কোনও বড় দুর্ভাগ্যের বিষয় নয়। আপনার লজ্জা হওয়া উচিত! আপনি কি আপনার সন্তানদের ভালো ভবিষ্যতের কথা ভাবছেন না? আসুন আমাদের মধ্য থেকে অর্ধেক জন এই উদ্যোগের জন্য প্রাণ ডান করি! তাতে কি পার্থক্য় হবে? একটা চোখের কি মূল্য আছে? আপনার একটা চোখের কি প্রয়োজন যখন একজন আমাদের পথ দেখিয়ে সুখের দিকে নিয়ে যাচ্ছে? কেবলমাত্র আপনার চোখ এবং একজন বৃদ্ধের একটি পায়ের কারণে কি আমরা এই উদ্যোগ ছেড়ে চলে যাব?

– উনি মিথ্যা কথা বলছেন! বয়স্ক লোকটি মিথ্যা কথা বলছেন! অনি কেবল ভান করছেন যাতে তিনি ফিরে যেতে পারেন, – চারদিক থেকে সবাই বলে ওঠে।

– ভাইয়েরা, যারা আর দুরু যেতে চায় না , – বক্তা আবার বলেন , – তাদের অভিযোগ করে আমাদের উৎপীরিত করার পরিবর্তে ফিরে যাওয়া উচিত। যতদূর আমি জানি, আ,আমার যতক্ষণ জীবন থাকবে আমি এই বিজ্ঞ নেতার কে অনুসরণ করে যাব!

– আমরা সবাই অনুসরণ করব! আমরা যতক্ষণ বেঁচে থাকব আমরা সকলেই তাঁকে অনুসরণ করব!

নেতা নিরব ছিলেন।

সবাই তাঁর দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলতে শুরু করল:

– নেতা চিন্তায় মগ্ন!

– জ্ঞানী মানুষ!

– তাঁর কপালের দিকে তাকান!

– সর্বদা ভ্রুকুটি তাঁর মুখে!

– গম্ভীর!

– তিনি সাহসী! তাঁর সব আচরণ দেখেই তা বোঝা যায়।

– আপনি আবারও তা বলতে পারেন! বেড়া, লগি, ঝোপঝাড় – তিনি সব কিছুই চষে ফেলেন। তিনি কোনো কথা না বলে গম্ভীরভাবে মাটিতে নিজের লাঠি ঠুকতে থাকেন এবং তিনি কি ভাবছেন আপনাকে অনুমান  করতে হবে।

(পরের পৃষ্ঠা)

নেতা (1/3)

– ভাইয়েরা ও বন্ধুরা, আমি আপনার সমস্ত বক্তৃতা শুনেছি, তাই এখন আমি আপনাদের অনুরোধ করছি আমার কথা শোনার জন্য। যতক্ষণ আমরা এই অনুর্বর অঞ্চলে রয়েছি আমাদের সমস্ত আলোচনা ও কথোপকথনের কোনও মূল্য নেই। এই বালুকাময় পাথুরে মাটিতে এখনও পর্যন্ত কিছুই বাড়তে পারেনি, এই খরার কথা ছেড়েই দিন, আমরা এর আগে এই রকম খরা আর কখনও দেখিনি। আর কতদিন আমরা এভাবে একত্রিত হয়ে বৃথা বাক্য ব্যয় করব? গবাদি পশু না খেতে পেয়ে মরে যাচ্ছে, এবং খুব শীঘ্রই আমরা এবং আমাদের বাচ্চারাও অনাহার মারা পরব। আমাদের অন্য কোনো ভালো ও যুক্তিসম্মত সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। আমার মনে হয় আমাদের এই  অনুর্বর জায়গা ছেড়ে ভাল এবং ঊর্বর কোনো জায়গার সন্ধান করা উচিত কারণ এইভাবে আর বাঁচা যাবে না।

একটি সভায় ক্লান্ত কণ্ঠে কোনো অনুর্বর প্রদেশের বাসিন্দা কখনও এমনটি বলেছিল। আমার মনে হয় কখন এবং কোথায় সে এমন বলেছিল তা আমার ও তোমার জানার প্রয়োজন নেই। আমার ওপর বিশ্বাস রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে অনেক আগে কোনো জায়গায় এমনটি ঘটেছিল এবং এটাই যথেষ্ট। সত্যি কথা বলতে, এক সময় আমি মনে করতাম এই পুরো গল্পটি আমি কোনোভাবে রচনা করেছি কিন্তু ধীরে ধীরে আমার এই ভ্রম থেকে আমি নিজেকে মুক্ত করি। এখন আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে আমি সত্যিই যা ঘটেছিল তা অবশ্যই উল্লেখ করতে যাচ্ছি এবং অবশ্যই কোথাও না কোথাও এমন ঘটনা ঘটেছিল আর এটা আমি বানিয়ে বানিয়ে বলছি না।

ফ্যাকাসে, ক্লান্ত এবং অভিব্যক্তিহীন মুখ, বিষন্ন, লক্ষ্যহীন দৃষ্টি বেল্টের নিচে হাথ রাখা এই মানুষগুলি যেন এই যুক্তিপূর্ণ কথাগুলি শুনে সম্বিত ফিরে পায়। প্রত্যেকে ইতিমধ্যে কল্পনা করছিল তারা কোনো জাদুকরি, স্বর্গিয়ে জগতে বসবাস করে যেখানে তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফল স্বরূপ তারা সমৃদ্ধ লাভ করতে পারবে।

– ঠিক কথা! ঠিক কথা! – চারিপাশের ক্লান্তি কণ্ঠস্বর ফিসফিস করে বলে উঠল।

– এই জায়গাটি কি কাছাকাছি কোথাও আ-ছে? – কোণের দিক থেকে একটি কন্ঠস্বর ধীর গতিতে বলে উঠল।

– ভাইয়েরা! – অন্য একজন আরো একটু দৃঢ় কণ্ঠে বলতে শুরু করে। – আমাদের অবশ্যই এই পরামর্শটি অবিলম্বে অনুসরণ করতে হবে কারণ আমরা আর এইভাবে জীবনযাপন করতে পারব না। আমরা অনেক পরিশ্রম করেছি অনেক কষ্ট ভোগ করেছি কিন্তু সব বৃথা গিয়েছে। আমরা বীজ বপন করেছি যা আমরা খাদ্য় হিসাবে খেতে পারতাম, বন্যা এসে ঢাল থেকে সেই সমস্ত বীজ মাটি সমেত ধুয়ে নিয়ে গেছে, শুধু পাথর রয়ে গেছে। আমাদের কি চিরকাল এখানে থাকতে হবে, ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত, নগ্ন, খালি পায়ে সকাল থেকে রাত অবধি পরিশ্রম করা সত্তেও? আমাদের অন্য কোথাও ঊর্বর মাটির সন্ধানে যাওয়া উচিৎ যেখানে আমাদের কঠোর পরিশ্রমের ফলে ফসল ফলবে।

– চলো যাওয়া যাক! এখুনি যাওয়া যাক কারণ এই জায়গাটা আর বসবাসের যোগ্য নয়।

ফিসফিস আওয়াজ উঠতে থাকে, এবং প্রত্যেকে হাঁটতে শুরু করে, কেউ ভাবেনা তারা কোথায় চলেছে।

– দাঁড়াও ভাইয়েরা! কোথায় যাচ্ছেন? – প্রথম বক্তা অবার বলে ওঠে। – অবশ্যই আমাদের যেতে হবে, তবে এভাবে নয়। আমরা কোথায় যাচ্ছি তা জানতে হবে। অন্যথায় আমরা নিজেদের বাঁচানোর পরিবর্তে আরও খারাপ পরিস্থিতিতে গিয়ে পরব। আমার প্রস্তাব আমাদের এমন একজন নেতা কে বেছে নেওয়া উচিত যাঁকে আমরা সবাই মেনে চলব ও যে আমাদের সবথেকে ভালো পথ দেখাবেন।

– আসুন নির্বাচন করুন! আসুন এখনই কাউকে বেছে নেওয়া যাক – চারিদিক থেকে শোনা গেল।

কিন্তু তখনই তর্ক শুরু হয়, সত্যিকারের বিশৃঙ্খলা। প্রত্যেকে কথা বলছিল, কেউ শুনছিল না, শুনতে পাচ্ছিলও না। তারা আলাদা আলদা দলে বিভক্ত হতে শুরু করে, প্রতিটি ব্যক্তি নিজেই বিড়বিড় করতে শুরু করে, আর তারপর সেই দলগুলিও ভেঙে যায়। দু’জন দু’জনে করে একে ওপরের হাত ধরে কথা বলতে শুরু করে প্রতেকেই কিছু প্রমাণ করতে চেষ্টা করে, একে অপরের হাতা ধরে টানাটানি শুরু করে, এবং অন্যকে হাত দেখিয়ে চুপ করাতে চেষ্টা করে। তারপরে তারা সকলে আবার একত্র হয়ে, কিন্তু তবুও কথা বলে চলে।

– ভাইয়েরা! – হঠাৎ করেই একটি শক্তিশালী কণ্ঠস্বর শোনা যায় যা অন্য সব কোলাহল বন্ধ করে দেয়। – এইভাবে আমরা কোনো মীমাংসায় পৌঁছাতে পারব না। প্রত্যেকে কথা বলছে এবং কেউ শুনছে না। আসুন একজন নেতা কে বেছে নেওয়া যাক! আমাদের মধ্যে থেকে কাকে বেছে নেওয়া যায়? আমাদের মধ্যে কে রাস্তাগুলি জানার মত যথেষ্ট ভ্রমণ করেছেন? আমরা সবাই একে অপরকে ভালো করে জানি, এবং তবুও আমি নিজে কে এবং আমার সন্তানদের এখানে হাজির কোনো ব্যক্তির নেতৃত্বের অধীন করতে চাই না। বরং আমাকে বলুন যে কে ওই ভ্রমণকারী যে সকাল থেকে ওই রাস্তার ধারে ছায়ায় বসে আছে?

সবাই চুপ হয়ে যায়। সকলেই অপরিচিত ব্যক্তির দিকে ঘুরে দাঁড়ায় এবং তার মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখতে থাকে।

মধ্যবয়সী ভ্রমণকারীর মলিন মুখ প্রায় দেখা যাচ্ছিল না লম্বা দাড়ি ও চুলের আড়ালে, আগের মতোই সেখানে চুপ করে বসে থাকেন, চিন্তায় আছন্ন মাঝে মাখে হাতের লম্বা লাঠি মাটিতে ঠুকতে থাকেন।

– গতকাল আমি ওই লোকটিকে একটি ছোট ছেলের সাথে দেখেছি। তারা দুজনে হাত ধরে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। এবং গত রাতে ছেলেটি গ্রাম ছেড়ে চলে যায় কিন্তু এই অপরিচিত লোকটি এখানেই থাকে যান।

– ভাইয়েরা, আসুন আমরা এই যুক্তিহীন তর্ক ভুলে যাই যাতে আর সময় নষ্ট না হয়। ওই ব্যক্তি যেই হোক না কেন, তিনি অনেক দূর থেকে এসেছেন তাই আমরা কেউ থাকে চিনি না এবং আমাদের নেতৃত্ব দেওয়ার সবচেয়ে কম দূরত্বের এবং সর্বোত্তম পথ নিশ্চই তাঁর জানা। আমার বিচারে তিনি একজন অত্যন্ত জ্ঞানী ব্যক্তি কারণ তিনি ওখানে চুপচাপ বসে চিন্তা করছেন। অন্য যে কেউ ইতিমধ্যে দশ বার আমাদের বিষয় নাক গলাতে আসত এবং কথোপকথন শুরু করে দিত আমারদের মধ্যে কারুর সাথে কিন্তু সে সারাক্ষণ ওইখানে চুপচাপ বসে আছেন কিছুই বলছেন না।

– অবশ্যই লোকটি চুপ করে বসে আছেন করুন তিনি কোনো ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করছেন। অন্যথায় আর কিছু নয়, তিনি খুবই বুদ্ধিমান – সবাই একমত হলেন এবং একসাথে অবার অপরিচিত ব্যক্তিটি কে নিরীক্ষণ করতে শুরু করলেন। প্রত্যেকেই তাঁর মধ্যে একটি উজ্জ্বল বৈশিষ্ট্য আবিষ্কার করেছিলেন, যা তাঁর অসাধারণ বুদ্ধির প্রমাণ।

তাঁরা আর কথা বলায় বেশি সময় ব্যয় করলেন না, সুতরাং অবশেষে সকলেই একমত হলেন যে ভ্রমণকারীকে জিজ্ঞাসা করাই ভাল হবে – যাঁকে, তারা ভাবছিলেন ঈশর এই ব্যক্তিটি কে তাঁদের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছেন তাঁদের পথ দেখিয়ে অন্য কোনো ঊর্বর ভালো জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্য। এই ব্যক্তিরই তাদের নেতা হওয়া উচিত এবং তারা এঁর কথা শুনবেন কোনো প্রশ্ন না করে।

তারা নিজের মধ্য থেকে দশ জন কে বেছে নেয় তাদের সিদ্ধান্ত অপরিচিত ব্যক্তির কাছে গিয়ে ব্যাখা করবার জন্য। এই প্রতিনিধিদলটি ওপর দ্বায়িত্ব ছিল অপরিচিত ব্যক্তি কে তাদের শোচনীয় পরিস্থিতিরে কথা বলা ও তাঁকে তাদের নেতা হওয়ার অনুরোধ করার।

দশজন গিয়ে নম্রভাবে মাথা নত করল। তাদের মধ্যে একজন এই অঞ্চলের অনুৎপাদনশীল মাটি সম্পর্কে, খরার সময়ের কথা এবং তাদের দুর্দশার কথা বলতে শুরু করে। তিনি তাঁর বক্তব্য নিম্নলিখিত পদ্ধতিতে শেষ করেন:

– এই পরিস্থিতি আমাদের বাধ্য করছে আমাদের বাড়িঘর এবং জমি ছেড়ে চলে যেতে আরো ভালো বাস উপযুক্ত স্থানের সন্ধানে। যে মুহুর্তে আমরা এই সিদ্ধান্ত পৌছাই, যেন ঈশ্বর আমাদের ওপর করুনাময় হয় আপনাকে আমাদের কাছে পাঠিয়ে দেন – আপনি একজন জ্ঞানী ও যোগ্য অপরিচিত – এবং আপনি আমাদের নেতৃত্ব দেবেন এবং আমাদের দুর্দশা থেকে মুক্ত করবেন। এখানকার সমস্ত বাসিন্দাদের হয় আমরা আপনাকে আমাদের নেতা হতে অনুরোধ করছি। আপনি যেখানেই যাবেন, আমরা আপনাকে অনুসরণ করব। আপনি রাস্তা চেনেন এবং অবশ্যই আপনি কোনো সুখের ও ভালো স্থানে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। আমরা আপনার কথা শুনব এবং আপনার প্রতিটি আদেশ পালন করব। হে, বিজ্ঞ অচেনা মানুষ আপনি কি এতগুলি প্রাণকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে রাজি হবেন? আপনি কি আমাদের নেতা হবেন?

এই অনুনয় পূর্ণ বক্তৃতা চলাকালীন সেই জ্ঞানী অপরিচিত ব্যক্তি একবারও মাথা তোলেন না। পুরো সময় তিনি সেই একই অবস্থানে থেকেন যেভাবে তাঁরা তাঁকে প্রথমে দেখতে পেয়েছিল। তাঁর মাথা নীচু, চেহারায় ভ্রূকুটি, কোনো কথা বলেন না। কিছু সময় অন্তর হাতের লাঠি দিয়ে মাটি ঠুকতে থাকেন এবং – চিন্তা করতে থাকেন। বক্তৃতা শেষ হওয়ার পরে নিজের অবস্থান না বদলে তিনি ধীরে এবং রূঢ়হ ভাবে বিরিবির করে বলেন:

– আমি করব!

– আমরা কি তাহলে আপনার সাথে যেতে পারি এবং আরও ভাল জায়গার সন্ধান করতে পারি?

– পারেন! – তিনি মাথা না তুলে বলে যান।

সবার মুখে উৎসাহ এবং প্রশংসা ফুটে ওঠে, কিন্তু অপরিচিত ব্যক্তিটি তা দেখেও একটি শব্দ বলেন না।

দশজন সমবেত বাকি সবাই কে গিয়ে তাদের সাফল্যের কথা জানায়, এবং এও বলে তারা এখন বুঝতে পেরেছে এই ব্যক্তি বিপুল জ্ঞানের  ভান্ডারের অধিকারী।

– তিনি ঘটনাস্থল থেকে সরে যাননি করা তাঁর সাথে কথা বলছে দেখার জন্য মাথাও তোলেননি। তিনি কেবল চুপচাপ বসে ধ্যান করতে থাকেন। আমাদের সমস্ত আলোচনা এবং প্রশংসার উত্তরে তিনি কেবল চারটি কথা বলেন।

– সত্যিকারের একজন ঋষি! বিরল বুদ্ধিসম্পন্ন! – চারিদিক থেকে তাঁরা আনন্দে চিৎকার করে বলে ওঠেন স্বর্গ থেকে ঈশ্বর নিজেই একজন ফেরেশতা পাঠিয়ে দিয়েছেন তাদের বাঁচানোর জন্য। সকলেই এমন নেতার নেতৃত্বের অধীনে সাফল্যের দৃঢ় প্রত্যয়ী ছিলেন, যাকে বিশ্বের কোনও কিছুই হতাশ করতে পারে না। এবং তাই পরের দিন ভোরবেলায় যাত্রা শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

(পরের পৃষ্ঠা)

ছাপ দেওয়া

আমি একটা খারাপ স্বপ্ন দেখি। আমি নিজেও স্বপ্নে এত বিস্মিত হই না, তবে আমি অবাক হয়ে ভেবে যে আমার মধ্যে খারাপ স্বপ্ন দেখার মত সাহস কি করে আসে, যখন আমি নিজে একজন শান্ত এবং শ্রদ্ধেয় নাগরিক, আমাদের ভালোবাসার, দুস্থ মা সার্বিয়ার একজন বাধ্য ছেলে, তার অন্যান সন্তানদের মতোই। অবশ্যই, আপনি জানেন, আমি যদি কোনও ক্ষেত্রেই ব্যতিক্রম হতাম তবে এটি অন্যরকম হত, কিন্তু না, আমার প্রিয় বন্ধু, আমি অন্য সবার মতোই একই কাজ করি যেমন সব কাজের প্রতি যত্নবান হওয়া সেই ক্ষেত্রে আমাকে কেউ টেক্কা দিতে পারবে না। একবার আমি রাস্তায় একজন পুলিশ কর্মির ইউনিফর্মের একটি চকচকে বোতাম পড়ে থাকতে দেখি, আমি প্রায় পেরিয়ে চলে যাচ্ছিলাম তখন চকচকে বোতামটা আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে, আমার মন মধুর স্মৃতিতে পূর্ণ হয় যায়, যখন হঠাৎ আমার হাত কাঁপতে লাগল এবং আমি সেলাম করালাম; আমার মাথা নিজেই মাটির দিকে নত হল এবং আমার মুখে সেই হাঁসি ফুটে উঠলো যেমন করে আমাদের উর্ধ্বতনদের শুভেচ্ছা জানানোর সময় হাঁসতাম।

– আমার শিরায় আভিজাত্যের রক্ত বইছে – নিশ্চই এটাই কারণ! – সেই মুহুর্তে আমি এটাই চিন্তা করি এবং পাশ দিয়ে যে অভদ্র লোকেরা বোতামের ওপর অযত্নে পা দিয়ে চলে যাচ্ছিল তাদের দিকে বিরক্তির সাথে তাকাই।

– অভদ্র! – আমি বিরক্ত ভাবে বললাম, এবং থুতু ফেললাম, এবং তারপরে চুপচাপ হেঁটে গেলাম, এই ভেবে যে এইরকম অভদ্র মানুষ খুব কমই আছে, এবং আমি বিশেষভাবে খুশী হয়ছিলাম যে ঈশ্বর আমাকে আমার পূর্বপুরুষদের পরিশুদ্ধ হৃদয় এবং মহৎ ও শৌখিন রক্ত দিয়ে আশির্বাদ করেছেন।

আমি এখন নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন আমি দারুন একজন মানুষ, অন্য সম্মানিত নাগরিকদের থেকে মোটেও আলাদা নই, আপনিও তাই অবাক হবেন ভেবে কিভাবে আমার স্বপ্নে এই রকম একটি খরাপ ও বোকামির ঘটনা ঘটতে পারে।

সেদিন আমার সাথে অস্বাভাবিক কিছু ঘটেনি। আমি ভালো রকম রাত্রি ভোজন করার পরে আমার করে দাঁত খুঁটছিলাম; আমার ওয়াইনে চুমুক দিচ্ছিলাম এবং তারপরে, নাগরিক হিসাবে আমার অধিকার সাহস ও আন্তরিকতার সাথে ব্যবহার করার পরে, আমি একটা বই নিয়ে বিছানায় শুতে যাই আরও দ্রুত ঘুমিয়ে পোড়ার জন্য।

বইটি শীঘ্রই আমার হাত থেকে পড়ে যায় অবশ্যই, আমার আকাঙ্ক্ষাক পূরণ করে, আমার সমস্ত দায়িত্ব পালনের পরে আমি একটি নির্দোষ ভেড়ার মত শান্তিতে ঘুমিয়ে পরি।

হঠাৎ করে আমি নিজেকে পর্বতের মধ্যে একটি সরু কাদাময় রাস্তার উপর দেখি। রাতটি ঠাণ্ডা এবং অন্ধকার ছিল। পাতা শূন্য গাছের ডালের মধ্য দিয়ে ঠাণ্ডা হওয়া বইছিল যা চামড়া কেটে যাচ্ছিল রেজারের মতো। আকাশ ছিল অন্ধকার, নিস্তব্ধ, ভয়াবহ আর তুষার ছিল ধুলার মতো, চোখে ঢুকে যাচ্ছিল, মুখে লাগছিল। আসেপাশে অন্য কোনো প্রাণী দেখা যাচ্ছিল না। আমি তাড়াহুড়ো করে এগিয়ে যাচ্ছিলাম এবং মাঝে মাঝেই রাস্তার কাদায় পিছলে পরছিলাম। ঘুরতে ঘুরেতে, পরে যেতে যেতে, অবশেষে আমি রাস্তা হারাই – ভগবান জানেন কোথায়, এটি কোনো ছোট্ট সাধারণ রাত ছিল না, রাতটা এক শতাব্দীর মত দীর্ঘ ছিল, এবং আমি জানিনা কোথায় আমি হেঁটেই চলেছিলাম।

তাই আমি বহু বছর ধরে হেঁটে চলি এবং অনেক অনেক দূরের কোনো এক জায়গায় গিয়ে পৌঁছাই মার জন্মভূমি থেকে অনেক দূরের কোনো অদ্ভূত জায়গায়, সেই জায়গার কথা হয়তো কেউ জানে না এবং যা আমি নিশ্চিত, কেবল স্বপ্নেই দেখা যায়।

সেই জায়গায় ঘুরতে ঘুরতে আমি একটি বড় শহরে এসে পরি যেখানে অনেক মানুষের বাস। বড় একটি বাজারে অনেক ভিড় ছিল, ভয়ঙ্কর একটি আওয়াজ হচ্ছিল, কানের পর্দা ফেটে যাওয়ার উপক্রম। আমি বাজারে মুখোমুখি একটি সরাইখানায় গিয়ে উঠি এবং মালিক কে জিজ্ঞাসা করি এত লোকে ভিড় কেন করেছে…

– আমরা শান্ত ও শ্রদ্ধেয় মানুষ, – তিনি তাঁর গল্পটি শুরু করেন – আমরা ম্যাজিস্ট্রেটের অনুগত এবং বাধ্য।

– ম্যাজিস্ট্রেট কি আপনাদের সর্বোচ্চ কর্তা? – আমি তাকে বাধা দিয়ে জিজ্ঞাসা করি।

– ম্যাজিস্ট্রেট এখানকার সর্বেসর্বা এবং তিনিই আমাদের সর্বোচ্চ কর্তা; তারপরে পুলিশ।

আমি হাসি।

– হাসছেন কেন?… আপনি কি জানতেন না?… আপনি কোথা থেকে আসছেন?

আমি তাকে বলি আমি কিভাবে পথ হারিয়ে ফেলেছি, এবং আমি বহু দুরের একটি দেশ – সার্বিয়া থেকে এসেছি।

– আমি সেই বিখ্যাত দেশের কথা শুনেছি! – বাড়িওয়ালা নিজেই ফিসফিস করে বলে,  আমার দিকে শ্রদ্ধার সাথে তাকিয়ে, তারপরে তিনি উচ্চস্বরে বললেন:

– সেটাই আমাদের ধারা, – তিনি বলতে থাকেন, – ম্যাজিস্ট্রেট তাঁর পালিশ নিয়ে এখানে আধিপত্য করে।

– আপনাদের পুলিশ কেমন?

– বিভিন্ন ধরণের পুলিশ আছে – এবং তারা তাদের পদমর্যাদা অনুসারে আলাদা হয়। বিশিষ্ট এবং কম বিশিষ্ট পুলিশ আছে… আপনাকে আগেই বলেচি আমরা শান্তিপ্রিয়, শ্রদ্ধেয় মানুষ কিন্তু আসপাসের এলাকা থেকে অভদ্র মানুষেরা এসে পড়ে, তারা আমাদেরকে দুর্নীতিগ্রস্ত করে এবং আমাদের মন্দ নিজিস শেখায়। আমাদের প্রত্যেক নাগরিককে অন্য ব্যক্তির থেকে আলাদা করার জন্য ম্যাজিস্ট্রেট গতকাল একটি আদেশ দিয়েছিলেন যে আমাদের সমস্ত নাগরিককে স্থানীয় আদালতে যেতে হবে, যেখানে আমাদের প্রত্যেকের কপালে লোহা গরম করে ছাপ দেওয়া হবে। এই কারণেই এত লোক একত্রিত হয়েছে: কি করা উচিত সে বিষয়ে পরামর্শ করতে।

আমি হতবাক হয়ে ভেবেছিলাম যে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমার এই অদ্ভুত দেশ থেকে পালানো উচিত, কারণ আমি একজন সার্ব হওয়া সত্তেও এমন শৌখিন চেতনার সাথে অভ্যস্ত ছিলাম না, এবং এই সম্পর্কে আমার কিছুটা অস্বস্তি হচ্ছিল!

বাড়িওয়ালা সদয়ভাবে হেসে ওঠে, এবং আমার কাঁধে হাত রেখে গর্বের সাথে বলেন:

– আহ, অপরিচিত, আপনি কি এতেই ভয় পেয়ে গেলেন? এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই, আমাদের মতো সাহসী হতে গেলে আপনাকে অনেক দূর যেতে হবে!

– আপনি কি বলতে চাইছেন? – আমি ভীত হয় জিজ্ঞাসা করি।

– কি দুর্দান্ত প্রশ্ন! আপনি দেখতে চান আমরা কতটা সাহসী। আমাদের মত সাহসী হতে আপনাকে অনেক কষ্ট করতে হবে। আপনি অনেকদূর ভ্রমণ করেছেন এবং জগৎ দেখেছেন, তবে আমি নিশ্চিত যে আপনি আমাদের চেয়ে বড় বীর কখনও দেখেননি। আসুন আমরা একসাথে সেখানে যাই। আমাকে তাড়াতাড়ি যেতে হবে।

আমরা যেতে যাচ্ছি ঠিক তখনি আমরা সামনের দরজায় চাবুকের অওয়াজ শুনলাম।

আমি বাইরে উঁকি দিলাম: একটা দেখার মত দৃশ্য ছিল– একটা লোক মাথায় চকচকে, তিনটি শিংযুক্ত পদস্থ টুপি, জমকালো পোশাক পড়ে অন্য একটা লোকে পিঠে চড়ে চাচ্ছিল যার পরনে ছিল দামি কিন্তু সাধারণ ধাঁচের। তিনি সরাইখানার সামনে দাড়ান এবং আরোহী নেমে আসেন।

বাড়িওয়ালা বাইরে গিয়ে মাথা মাটিতে মাথা নত করেন, এবং জমকালো পোশাক পড়া ব্যক্তিটি সরাইখানার ভিতরে একটি  সজ্জিত টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। সাধারণ নাগরিকের পোশাক পড়া লোকটি সরাইখানার সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন। বাড়িওয়ালা তাকে দেখেও মাথা নত করে প্রণাম করেন।

– এই সব কি হচ্ছে? – আমি হতবাক হয় বাড়িওয়ালাকে জিজ্ঞাসা করলাম।

– যিনি সরাইখানার ভিতরে গেলেন তিনি একজন উচ্চ পদস্থ পুলিশ, এবং এই ব্যক্তিটি আমাদের অন্যতম বিশিষ্ট নাগরিক, খুব ধনী, এবং একজন মহান দেশপ্রেমিক – বাড়িওয়ালা ফিসফিস করে বললেন।

– তবে কেন উনি অন্য একজনকে তাঁর পিঠে চড়তে দিয়েছেন?

বাড়িওয়ালা আমার দিকে মাথা নাড়লেন এবং আমরা একপাশে সরে দাঁড়ালাম। তিনি আমাকে একটি অবজ্ঞাপূর্ণ হাসি দিয়ে বললেন:

– আমরা এটিকে একটি মহান সম্মান হিসাবে বিবেচনা করি যা কদাচিৎ প্রাপ্য! – এ ছাড়াও তিনি আমাকে আরও অনেক কিছু বলেন কিন্তু আমি এতটাই উত্তেজিত ছিলাম যে আমি তার কথা বুঝতে পারিনা। তবে তিনি শেষে যা বলেন তা আমি পরিষ্কারভাবে শুনতে পাই: – এটি দেশের প্রতি এমন একটি সেবা যা সমস্ত জাতি এখনও প্রশংসা করতে শেখেনি!

আমরা বৈঠকে এসে পৌঁছায়ই তখন চেয়ারম্যান নির্বাচন করা শুরু হয় গিয়েছিল।

যদি আমি নামটির সঠিকভাবে মনে পারছি, প্রথম দলটি কল্ব নামক এক ব্যক্তিকে বেছে নেয়, চেয়ারের প্রার্থী হিসাবে তাদের প্রতিনিধিত্ব করতে; দ্বিতীয় দলটি তাল্ব কে চাইছিল এবং তৃতীয় দলের ও নিজস্ব প্রার্থী ছিল।

ভয়াবহ বিভ্রান্তি ছিল; প্রতিটি দল তাদের নিজস্ব প্রতিনিধির দাবি জানাচ্ছিল।

– আমি মনে করি যে এই জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সভার সভাপতির পদ গ্রহণ করার জন্য আমাদের কাছে কোল্বের চেয়ে বেশি উপযুক্ত ব্যক্তি আর কেউ নেই, – প্রথম দল থেকে একজন বলে ওঠে – কারণ আমরা সকলেই নাগরিক হিসাবে তাঁর গুণাবলী এবং তার দুর্দান্ত সাহসের কথা জানি। আমি   গর্ব করে বলতে পারি যে এখানে আমাদের মধ্যে অন্য আর কেউ উপস্থিত নেই যার পিঠে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা এত বড় চড়েছেন…

– এ সম্পর্কে কথা বলার আপনি কে, – দ্বিতীয় দলের কেউ প্রতিবাদ জানায়। – আপনার পিঠে কখনও কোনো নিম্ন পদস্থ পুলিশ ক্লার্ক ও চড়েনি!

– আমরা আপনার গুন সম্পর্কে অবগত, – তৃতীয় দলের কেউ চিৎকার করে বলে ওঠে। – আপনি কখনও চিৎকার না করে চাবুকের এক ঘা ও সহ্য করতে পারেননি!

– একটি কথা ঠিক করে বুঝে নেওয়া ভালো! – কল্ বলতেব শুরু করেন। – এটা ঠিক যে দশ বছর আগের থেকে আমার পিঠে বিশিষ্ট ব্যক্তিরা চড়ছেন; তাঁরা আমাকে চাবুক মেরেছেন এবং আমি এক বারও আয়জায় করিনি, এটা হতেই পারে আমাদের মধ্যে আরো বেশি যোগ্য কোনো ব্যক্তি আছেন। সম্ভবত আরো ভালো এবং বয়স কম।

– না, না, – তাঁর সমর্থকরা কেঁদে ওঠেন।

– আমরা পুরানো পুরষ্কার সম্পর্কে শুনতে চাই না! দশ বছর পেরিয়ে গেছে শেষ যখন কেউ কল্বের পিঠে চড়েছিল, – দ্বিতীয় দল চেঁচিয়ে বলে উঠল।

– কম বয়সীরা দ্বায়িত্ব গ্রহণ করছে বয়স্কদের যেতে দিন – তৃতীয় দলের কিছু লোক বলে উঠল।

হঠাৎ সব নিস্তব্ধ হয়ে গেল; লোকে পিছনে সরে গেল, ডাইনে বাঁয়ে সরে গেল, রাস্তা ছেড়ে দেওয়ার জন্য এবং আমি প্রায় ত্রিশ বছরের এক যুবককে দেখতে পেলাম। তিনি যখন সামনে এগিয়ে আসছিলেন অন্য সবাই মাথা নত করছিল।

– ইনি কে? – আমি আমার বাড়িওয়ালাকে ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করলাম।

– উনি একজন জনপ্রিয় নেতা। একজন যুবক, কিন্তু খুব আশাব্যঞ্জক। প্রথম দিকে উনি দিনে তিনবার ম্যাজিস্ট্রেটকে তার পিঠে বহন করেছিলেন বলে গর্ব করতেন। তিনি অন্য সবার চেয়ে বেশি জনপ্রিয়।

– ওরা সম্ভবত এনাকেই নির্বাচিত করবেন? – আমি জিজ্ঞাসা করলাম।

– সেটা হওয়ার সম্ভাবনাই সব থেকে বেশি, কারণ অন্য সব প্রার্থীরা – তারা সবাই বয়স্ক, সময়ের কাছে তাদের হার হয়ছে, সেই জায়গায় ম্যাজিস্ট্রেট গতকাল এঁর পিঠে কিছুক্ষণ চড়েছিলেন।

– এনার নাম কি?

– ক্লেয়ার্ড।

তারা তাঁকে সম্মানের জায়গা দেয়।

– আমি মনে করি, – কল্বের কণ্ঠস্বর নীরবতা ভঙ্গ করে – আমরা এই পদের জন্য ক্লেয়ার্ডের চেয়ে বেশি উপযুক্ত ব্যক্তি আর খুঁজে পাবনা। উনি একজন যুবক কিন্তু তবুও বয়স্কদের মধ্যেও কেউ তাঁর সমান নয়।

– ক্লেয়ার্ডের জয়!… ক্লেয়ার্ড দীর্ঘজীবী হন! – সমস্ত কণ্ঠস্বর গর্জে উঠলো।

কল্ব এবং তাল্ব তাকে চেয়ারম্যানের কাছে নিয়ে গেলেন। সবাই অনেকটা মাথা নত করল, একেবারে নিস্তব্ধতা ছিল।

– ভাইয়েরা, আপনার উচ্চ সম্মান আমাকে সর্বসম্মতভাবে দিয়েছেন তার জন্য ধন্যবাদ। আপনাদের আস্থা আছে আমার উপর জেনে আমি বাধিত। এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলিতে জাতির ইচ্ছার জাহাজ চালানো করা সহজ নয়, তবে আমি আপনাদের বিশ্বাসকে যথাযত সম্মান দেওয়ার চেষ্টা করব, সততার সাথে আপনাদের মতামতের প্রতিনিধিত্ব করব এবং এবং যে সম্মান আপনারা আমাকে দিয়েছেন তার যথার্থতা প্রমাণ করতে সব রকম চেষ্টা করব। ভাইয়েরা, আমাকে নির্বাচন করার জন্য ধন্যবাদ।

– হুররে! হুররে! হুররে! – ভোটাররা চারদিক থেকে উল্লাস করে ওঠেন।

– এবং এখন, ভাইয়েরা, আমি আশা করি আপনারা এই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটি সম্পর্কে আমাকে কিছু কথা বলার অনুমতি দেবেন। আমাদের মধ্যে যে রকম যন্ত্রণা আর কষ্ট জমে আছে তা সহ্য করা সহজ নয়; কারুর পক্ষেই কপালে গরম লোহার ছাপ লাগানো সহজ নয়। আসলে, না – এমন কিছু যন্ত্রণা আছে যা সব পুরুষ সহ্য করতে পারে না। কাপুরুষদের ভয় কাঁপতে দিন, তারা ভয়ে জ্বলে উঠুক, তবে আমরা এক মিনিটের জন্যও যেন না ভুলি যে আমরা সাহসী পূর্বপুরুষের পুত্র, যে মহৎ রক্ত আমাদের শিরাগুলিতে বইছে, আমাদের ঠাকুরদাদের বীরত্বপূর্ণ রক্ত, মহান নাইটরা যারা এক বারও পলক না ফেলে মন্রণ স্বরিকার করত স্বাধীনতা এবং আমাদের সবার মঙ্গলের জন্য, আমরা তাদের তাদের বংশধর। আমাদের যন্ত্রণা সামান্য, আপনি যদি তাদের কষ্টের কথা ভাবেন – আমরা কি এখন আগের চেয়ে অধিকতর উন্নত জীবনযাপন করছি বলে কি আমরা অধঃপতিত ও কাপুরুষোচিত জাতের সদস্যদের মতো আচরণ করব? প্রতিটি সত্য দেশপ্রেমিক, প্রত্যেকে যারা আমাদের জাতিকে সমস্ত বিশ্বের সামনে লজ্জায় ফেলতে চান না, তারা একজন মানুষ এবং বীরের মতো যন্ত্রণা সহ্য করবেন।

– ক্লেয়ার্ডের জয়!… ক্লেয়ার্ড দীর্ঘজীবী হন!

ক্লেয়ার্ডের পরে বেশ কিছু উজ্জীবিত বক্তা কথা বলেছিলেন; তারা আতঙ্কিত লোকদের উৎসাহিত করছিলেন এবং ক্লেয়ার্ড যা বলেছিল কমবেশি তারই পুনরাবৃত্তি করছিলেন।

তারপরে একজন ফ্যাকাশে ক্লান্ত মুখের বৃদ্ধ মানুষ, কথা বলার আজ্ঞা চান, তাঁর মুখে বলি রেখা ছিল এবং চুল ও দাড়ি বরফের মতো সাদা ছিল। তার হাঁটু বয়সের কারণে কাঁপছিল, হাত কাঁপছিল, পিঠ বেঁকে গিয়েছিল।তাঁর কণ্ঠস্বর কাঁপছিল, চোখ অশ্রুর কারণে উজ্জ্বল ছিল।

– সন্তানেরা, – তিনি শুরু করেন, কুঁচকানো গালের ওপর দিয়ে তার সাদা দাড়ির মধ্য দিয়ে কান্না ঝড়ে পরছিল, – আমার অবস্থা খুব খারাপ এবং আমি শীঘ্রই মারা যাব তবে আমার মনে হচ্ছে আপনারা এই জাতীয় লজ্জা আপনাদের কাছে আসতে দিয়ে চান না। আমার বয়স একশ বছর, এবং আমি ওটা ছাড়া সমস্ত জীবন কাটিয়েছি! … দাসত্বের ছাপ এখন আমার সাদা এবং ক্লান্ত মাথায় কেন লাগানো হবে? …

– ওই বৃদ্ধ দুর্বৃত্ত কে সরিয়ে ফেলো! – চেয়ারম্যান চিৎকার করে ওঠেন।

– ওকে সরিয়ে ফেলো! – অন্যরা চিৎকার করল।

– বুড়ো কাপুরুষ!

– যুবকদের উৎসাহিত করার পরিবর্তে উনি সবাইকে ভয় দেখাচ্ছেন!

– ওনার সাদা চুল সম্পর্কে ওনার লজ্জা হওয়া উচিত! উনি   যথেষ্ঠ সময় জীবিত আছেন আর এখনও ভয় পাচ্ছেন – আমরা তরুণরা অনার থেকে বেশি সাহসী…

– কাপুরুষ কে দূরে সরাও!

– ওনাকে বের করে দাও!

– ওনাকে দূরে সরাও!

সাহসী, যুবক দেশপ্রেমীর একটি ক্রুদ্ধ দল বৃদ্ধের দিকে ধেয়ে এলো এবং ক্রোধে তাকে ধাক্কা দিতে লাগল, তাকে ধরে টানাটানি করতে লাগল, এবং লাথি মারতে শুরু করল।

অবশেষে তারা তাঁকে তাঁর বয়সের কারণে ছেড়ে দিল – অন্যথায় তারা তাঁকে জীবন্ত পাথর মেরে মেরে ফেলতে পারত।

তারা প্রত্যেকে প্রতিজ্ঞা করল আগামীকাল সাহসী হওয়ার এবং নিজেদের জাতির গৌরব অর্জনের যোগ্য বলে প্রমাণ করার।

লোকেরা দুর্দান্ত শৃংখলাবদ্ধ ভাবে সভা ছেড়ে চলে গেলেন। যাওয়ার সময় তারা বলছিলেন:

– কাল আমরা দেখব কার কত সাহস!

– কাল আমরা মিথ্যা অহংকারীদের চিহ্নিত করতে পারব!

– যোগ্য লোকদের অযোগ্যদের থেকে আলাদা করার সময় এসেছে, যাতে প্রতিটি শঠ সাহসী হওয়ার গর্ব করতে পারবে না!

আমি আবার সরাইখানায় চলে গেলাম।

– আপনি কি দেখতে পেয়েছেন আমরা কি দিয়ে তৈরি? – আমার বাড়িওয়ালা আমাকে গর্বের সাথে জিজ্ঞাসা করলেন।

– প্রকৃতপক্ষে আমি দেখতে পেয়েছি, – আমি স্বয়ংক্রিয়ভাবে উত্তর দিলাম, আমার নিজেকে শক্তিহীন মনে হয় এবং আমার মনে অদ্ভূত চিন্তা ভাবনা ঘুরছিল।

সেদিনই আমি তাদের পত্রিকায় একটি শীর্ষস্থানীয় নিবন্ধ পড়েছিলাম যাতে লেখা হয়েছিল:

– নাগরিকগণ, এখন এসেছে অযৌক্তিক অহঙ্কার ও কপটতা বন্ধ করার; আমাদের কল্পিত গুণাবলী প্রদর্শনের জন্য দম্ভ করা বন্ধ করার সময় এসেছে। সময় এসেছে, নাগরিকরা, আমাদের দম্ভ আসল কি নকল তা  প্রমাণ করার, এখন প্রমাণ হয় যাবে কে যোগ্য আর কে যোগ্য নয়! তবে আমরা বিশ্বাস করি যে আমাদের মধ্যে এমন কোনও লজ্জাজনক কাপুরুষ নেই যাদেরকে জোর করে নির্ধারিত ছাপ মারার জায়েগায় নিয়ে যেতে হবে। আমরা প্রত্যেকে যারা নিজেদের শিরাতে পূর্বপুরুষদের রক্তের এক ফোঁটা অনুভব করি তারা গর্বের সাথে এবং নিঃশব্দে কষ্ট সহ্য করার জন্য প্রথম সারিতে দাঁড়াবে কারণ এটি আমাদের বলিদান আমাদের দেশ এবং আমাদের সকলের মঙ্গলের জন্য। সামনে এগিয়ে চলুন নাগরিকগণ, আগামীকাল মহৎ পরীক্ষার দিন!…

পরের দিন নিযুক্ত স্থানে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পৌছানোর জন্য আমার বাড়িওয়ালা সভা শেষ হওয়ার পরেই শুতে চলে গেলেন। অনেকে অবশ্য কাতারের একেবারে সামনে থাকার জন্য সরাসরি টাউন হলে চলে গেলেন।

পরের দিন আমিও টাউন হলে গেলাম। যুবক এবং বৃদ্ধ, পুরুষ এবং মহিলা সবাই সেখানে ছিলেন। কিছু মা তাদের ছোট সন্তানদের কোলে তুলে নিয়ে এসেছিলেন তাদের মাথায়ে ও দাসত্বের ছাপ লাগানোর জন্য, এটি তাদের জন্য সম্মানের বিষয় ছিল যাতে তারা বেসামরিক চাকুরীর উচ্চতর পদে অধিক অধিকার অর্জন করতে পারে।

সেখানে ঠেলাঠেলি গালাগালি চলছিল (এই বিষয় তারা সার্বদের মতোই, যা দেখে আমি একরকম খুশিই হয়ছিলাম) সবাই দরজার সামনে যেতে চাইছিল। কেউ কেউ অন্যের গলাও চাপে ধরছিল।

লোহার শিকগুলি সাদা আনুষ্ঠানিক পোশাক পরিহিত বিশেষ সরকারী কর্মচারী লাগছিলেন তারা মৃদুভাবে লোকেদের বকাবকি করছিলেন:

– ঈশ্বরের দোহাই ঠেলাঠেলি করবেন না, সবার সুযোগ আসবে – আপনারা জন্তু নন, ঠেলাঠেলির প্রয়োজন নেই।

ছাপ দেওয়া শুরু হল। একজন চিৎকার করে উঠলো, অন্য একজন ব্যথায় কঁকিয়ে উঠলো, তবে যতক্ষণ আমি সেখানে ছিলাম ততক্ষণ কেউ শব্দ না করে সহ্য করতে সক্ষম হয়নি।

আমি এই নির্যাতন বেশিক্ষণ দেখতে পারিনি, তাই আমি সরাইখানায় ফিরে যাই, কিন্তু সেখানে ইতিমধ্যেই কিছু লোক উপস্থিত ছিলেন, তারা খাবার খাচ্ছিলেন পান করছিলেন।

– শেষ! – তাদের মধ্যে একজন বলেন।

– আমরা তেমন চিৎকার করিনি, কিন্তু তাল্ব গাধার মত চিৎকার করছিল! … – বলল আরেকজন।

– দেখতে পাচ্ছেন আপনার তাল্ব কেমন, এবং আপনি গতকাল তাকে সভার চেয়ারম্যান বানাতে চাইছিলেন।

– আহ, আপনি কখনোই ঠিক বলতে পারেন না!

তারা ব্যথায় আর্তনাদ করতে করতে কথা বলছিল, কিন্তু একে ওপরের থেকে ব্যাথা লুকানোর চেষ্টা করছিল, কারণ তার চাইছিল না অন্যরা তাকে কাপুরুষ মনে করুক।

ক্লেয়ার্ড নিজের সম্মান হারিয়েছে কারণ সে কঁকিয়েছে, এবং লিয়ার নামক এক ব্যক্তি বীরপুরুষ হয় উঠেছে কারণ সে নিজের মাথায় দুটো চাপ লাগিয়েছে আর ব্যথায় লাগলেও কোনো শব্দ করেনি। সারা শহর শ্রদ্ধার সাথে শুধু তারই চর্চা করছে।

কিছু লোক পালিয়ে যায় কিন্তু সবাই তাদের নিন্দা করছে।

কিছু দিন পরে যার কপালে দুটি চাপ ছিল সে মাথা উঁচু করে গর্বের সাথে ঘুরে বেড়াতে লাগল, এবং সে যেখানেই যেত সবাই মাথ নিচু করে টুপি খুলে বীরকে অভিবাদন জানাত।

পুরুষ, মহিলা এবং বাচ্চারা তার পিছন পিছন ছুটে যেত জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষটিকে দেখতে। তিনি যেখানেই যেতেন বিস্ময়ে বিস্মিত হয় মানুষে তার পিছনে পিছনে যেত ফিসফিস করে বলতে বলতে: ‘লিয়ার লিয়ার!… এই সে!… এই সে বির পুরুষ যে চিৎকার করেনি যখন তার কপালে দুটি ছাপ দেওয়া হচ্ছিল!’ সংবাদপত্রের শিরোনামে তাঁকে প্রশংসিত ও মহিমান্বিত করা হয়েছিলেন।

এবং মানুষের ভালবাসা তার প্রাপ্য ছিল।

সমস্ত জায়গাতেই আমি এইরকম প্রশংসা শুনে আমার নিজেকে বৃদ্ধ মনে হতে লাগল, আমার শিরাতে অভিজাত্ সার্বীয় রক্ত প্রবাহিত হতে অনুভব করলাম, আমাদের পূর্বপুরুষরা বীর ছিলেন তারা স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিয়ে ছিলেন; আমাদের বীরত্বপূর্ণ অতীত এবং আমাদের কসোভোও রয়েছে। আমি জাতীয় গর্ব এবং অহঙ্কারের কারণে রোমাঞ্চিত বোধ করি এবং আমার জাতটি কতটা সাহসী তা দেখাতে আমি টাউন হলে ছুটে এসে চিৎকার করতে আগ্রহী হয় উঠি:

– আপনি আপনাদের লিয়ারের প্রশংসা কেন করছেন?… আপনারা কখনও আসল বীর দেখেননি! এসে নিজের চোখে দেখুন অভিজাত সার্বিয়ান রক্ত কেমন হয়! আমার মাথায় দুটি নয় দশটি চাপ লাগান!

সাদা পোশাক পরিহিত সরকারী কর্মচারী আমার কপালের কাছে একটি লোহার শিক নিয়ে আসে এবং আমি শুরু করি… আমার স্বপ্ন ভেঙে যায়।

আমি ভয়ে আমার কপাল ঘষি, স্বপ্নে কত অদ্ভূত ঘটনা দেখা যায় ভাবতে ভাবতে।

– আমি তাদের লিয়ারের গৌরব প্রায় ছাপিয়ে গিয়েছিলাম, – আমি ভেবে সন্তুষ্ট হই এবং পাশ ফিরি এবং আমার একটু দুঃখ হয় যে স্বপ্নটা মাঝখানে ভেঙে যায়।

 

বেলগ্রেডে, 1899।
“রাদ্বয়ে ডোমানোভিচ” প্রকল্পটির জন্য অনুবাদ করেছেন মৈত্রেয়ী মন্ডল, 2020।