Tag Archive | ভ্রমণ

নেতা (3/3)

(আগের পৃষ্ঠা)

এভাবে প্রথম দিন কেটে গেল এবং একই রকম সাফল্য অর্জন করতে করতে আরও অনেক দিন কাটল। খুব তাত্পর্যপূর্ণ কিছুই ঘটেনি, কেবল তুচ্ছ ঘটনা: “তার মুখ-থুবড়ে একবার খাদে পরে যায়, তারপর একটি গিরিসংকটে; তারপর ব্ল্যাকবেরির ঝোপে ঘষা লাগে; কাঁটায় পা দেন; অনেকের হাত পা ভাঙ্গে; অনেকে মাথায় আঘাত লাগে। কিন্তু এই সমস্ত যন্ত্রণা তারা সহ্য করে নিয়েছিল। কয়েকজন বৃদ্ধকে রাস্তায় মড়ার জন্য ফেলে যেতে হয়েছিল। „তাদের বাড়িতে রেখে আসলেও তারা মারা যেতো, রাস্তায় না হলেও!” মুখপাত্র বলেছেন, অন্যদের পথ কলতে উৎসাহিত করার জন্য। এক থেকে দুই বছর বয়সী কয়েকটি ছোট বাচ্চাও মারা গেল। পিতা-মাতা উদ্বেগহীনভাবে নিজেদের ব্যথা দমন করেছিলেন কারণ এটিই ঈশ্বরের ইচ্ছা। “আর বাচ্চাদের বয়স যত কম তাদের দুঃখ তত কম। যখন তাদের বয়স কম থাকে তাদের দুঃখও কম হয়। ঈশ্বরের ইচ্ছা অনুসারে বিবাহের বয়সে পৌঁছে গেলে সন্তানের যেন মৃত্যু না হয়।সন্তানদের যদি মরতেই হয় তবে কম বয়সে মরা ভালো। তাহলে দুঃখ এত বেশি হয় না!” মুখপাত্ররা তাদের আবার সান্ত্বনা দিয়ে বলেন। কেউ কেউ মাথায় কাপড় জড়িয়ে রাখেন এবং মাথায় ঠান্ডা জিনিস চাপান। অন্যরা হাতে পট্টি বেঁধে চলেন। সবাই ক্লান্ত ও আহত ছিলেন। তাদের জামা কাপড় জরাজীর্ণ, কিন্তু তারা খুশি হয়ে এগিয়ে চলতে থাকে। এগুলি সহ্য করা আরও সহজ হত যদি ক্ষুধার্ত না হতেন। তা সত্তেও তাদের পথ চলা চালিয়ে যেতে হবে।

একদিন, আরও উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটে।

নেতা সবার সামনে হেঁটে যাচ্ছিলেন, দলের সাহসী লোকেরা তাকে চারিদিক থেকে ঘিরে রেখেছিল। (তাদের মধ্যে দু’জন নিখোঁজ ছিল কিন্তু কেউ জানত না তারা কোথায় ছিল। সবার ধারণা ছিল তারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছে এবং পালিয়ে গেছে। একসময় মুখপাত্র তাদের লজ্জাজনক বিশ্বাসঘাতকতা সম্পর্কে কিছু বলেছিলেন। মাত্র কয়েকজন বিশ্বাস করেছিলেন যে পথে ওই দু’জন মারা গিয়েছিলেন, কিন্তু তারা অন্যদের উদ্বিগ্ন করতে চাননি তাই তারা নিজদের মতামত কাউকে জানানি।) দলের বাকিরা তাঁর পিছনে সারি বোধ্য করে ছিল। হঠাৎ দেখা গেল এক বিশাল বড় এবং গভীর, পাথুরে খাদ। ঢাল এত খাড়া ছিল যে কারুর এক পা সামনে এগোনোর সাহস হচ্ছিল না। এমনকি সব থেকে সাহসী ব্যক্তিরাও থামে গিয়ে নেতার দিকে তাকালেন। মাথা নীচু করে চিন্তায় মগ্ন হয়ে তিনি সাহস করে সামনে এগিয়ে গেলেন, তার বেতটি সামনে ঠুকতে ঠুকতে প্রথমে ডানদিকে, তারপর বাম দিকে, তার সভাব বৈশিষ্ট অনুসারে। অনেকে বলেছিলেন যে তিনি যখন এই রকম করেন তখন থাকে দেখে খুব অভিজাত মনে হয়। তিনি কারুর দিকে তাকান না কিছু বলেন না। তিনি যখন কিনারের দিকে এগিয়ে যাচ্চিলেন তখনও তাঁর মুখের অভিব্যক্তির কোনও পরিবর্তন বা ভয়ের চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায়নি। খুব সাহসী লোকেদের ও মুখে রক্ত শূন্য হয় গেছিল, কিন্তু নেতা কে সাবধান করার সহস কারুর ছিল না। কিনারে পৌঁছাতে আর মাত্র দুটি ধাপ বাকি ছিল। আতঙ্কে এবং চোখ খোলা রেখে তারা সকলে ভয় কাঁপতে থাকে। সাহসী লোকেরা শৃংখলা লঙ্ঘন করে প্রায়ে নেতা কে আঁকাতে যাচ্ছিল কিন্তু তখনই নেতা দুই ধাপ এগিয়ে গিয়ে খাদে ঝাঁপিয়ে পরেন। উদ্বেগ, হাহাকার, চিৎকার করে উঠে সবাই; ভয়ের জিত হয়। অনেকে পালাতে শুরু করেন।

– দাঁড়াও ভাইয়েরা! তাড়া কিসের? আপনারা কি এইভাবে কথা রাখেন? আমাদের অবশ্যই এই জ্ঞানী ব্যক্তিটি কে অনুসরণ করতে হবে কারণ তিনি জানেন তিনি কি করছেন। তিনি নিজেকে শেষ করে ফেলার মত উন্মাদ নন। আগে এগিয়ে যাওয়া যাক তার পিছনে পিছনে! এটিই সবচেয়ে বড় এবং সম্ভবত সর্বশেষ বিপত্তি, শেষ বাধা। কে জানে? সম্ভবত এই উপত্যকার অপর পারে আমরা একটি দুর্দান্ত, উর্বর জমি পাব যা ঈশ্বর আমাদের জন্য ঠিক করে রেখেছেন। এগিয়ে যাওয়া যাক! ত্যাগ ছাড়া আমরা কিছুই পাব না! – এগুলি ছিল মুখপাত্রের পরামর্শের বাণী এবং তিনিও উপত্যকার দিকে দুই ধাপ এগিয়ে গিয়ে অদৃশ্য হয় যান। সাহসীরা তাকে অনুসরণ করেন এবং তারপরে সবাই ঝাঁপিয়ে পরে।

সবাই চিৎকার-চেঁচামেচি, কান্নাকাটি করতে শুরু করে নিচে গড়িয়ে পড়তে পড়তে। যে কেউ শপথ করে বলতে পারে ওখান থেকে কারুর বেঁচে ফিরে আসর সম্ভাবনা ছিলনা। কিন্তু নেতা অস্বাভাবিকভাবে ভাগ্যবান ছিলেন। তিনি পড়ে যেতে যেতে একটি ঝোপ ধরে ঝুলে পরেন তাই তার বেশি আঘাত লাগেনা। তিনি নিজেই কষ্ট করে ধরে ধরে উঠে আসতে পারেন। খাদের নিচে যখন কান্নাকাটি, বিলাপ, চিৎকার-চেঁচামেচি চলছিল তিনি নিশব্দে ওপরে বসে ছিলেন। আহত এবং ক্রুদ্ধ কয়েকজন তাকে অভিশাপ দিতে শুরু করলেও তিনি কোনো ভ্রূক্ষেপ করেন না। ভাগ্যক্রমে যারা পড়ে যাওয়ার সময় ঝোপ বা গাছ ধরে রাখতে পেরেছিলেন তারা ওপরে উঠতে শুরু করে খাদ থেকে বেরোনোর জন্য। কারও কারও মাথা ফেটে গিয়েছিল বলে মুখ বেয়ে রক্ত ঝরছিল। নেতা ছাড়া বাকি সবার অঘাত লেগেছিল। তারা সকলেই হঠাৎ তাকে দেখে বিরক্তি প্রকাশ করে এবং যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকেন কিন্তু নেতা মাথা তোলেন না। তিনি নীরব থাকন একজন চিন্তাভাবনা রত সাধুর মত!

কিছু সময় কেটে গেল। যাত্রীর সংখ্যা দিনে দিনে কমতে থাকে। কেউ কেউ দল ছেড়ে আবার ফিরে যায়।

অত বড় দলটির মাত্র কুড়ি জন রয়ে যায়। তাদের ক্লান্ত মুখগুলোতে হতাশা, সন্দেহ, অবসন্নতা এবং ক্ষুধার লক্ষণ ফুটে উঠেছিল কিন্তু কেউ একটা কোথাও বলে না। তারা তাদের নেতার মতোই চুপচাপ হয়ে সামনে হেঁটে যাচ্ছিল। এমনকি উৎসাহী মুখপাত্র মরিয়া হয়ে মাথা নাড়াতে থাকেন। রাস্তা খুবই কঠিন ছিল।

দিন দিন তাদের সংখ্যা কম হতে থাকে শেষ পর্যন্ত মাত্র দশজন বাকি থেকে যায়। হতাশ মুখগুলি নিয়ে, তারা কেবল কথো না বলে হাহাকার এবং অভিযোগ করতে থাকে।

তাদের দেখে পঙ্গু মনে হয়। কেউ কেউ ক্রাচে ভোর দিয়ে ছিল। তাদের মধ্যে কিছু জন ঘাড়ের সাথে বাঁধা হাতের বন্ধনের ওপর ভোর দিয়ে হাঁটছিল। এবং তাদের হাতে আরো অনেক ব্যান্ডেজ ছিল। এমনকি যদি তারা নতুন ত্যাগ স্বীকার করতে চাইত, তারা করতে পারত না কারণ তাদের দেহে কোনও নতুন ক্ষতের জন্য প্রায় কোনও খালি জায়গায় ছিল না।

এমনকি তাদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী এবং সাহসীরা ও ইতিমধ্যে বিশ্বাস এবং আশা হারিয়ে ফেলেছিল তবে তারা লড়াই করে যাচ্ছিল; মানে তারা কোনো রকমে খুড়িয়ে খুড়িয়ে হাঁটছিল অভিযোগ করতে করতে, অনেক ব্যথা সহ্য করে। ফিরে যেতে না পারলে আর কি বা করার ছিল? এত ত্যাগ করেও এখন কি যাত্রা ছেড়ে চলে যাওয়া যায়?

গোধূলি হয়। ক্রাচে ভর করে খোড়াতে খোড়াতে তারা হঠাৎ দেখতে পেল যে নেতা আর তাদের সামনে নেই। আর একটি পদক্ষেপ নিতে তারা দেখল তারা আবার কোনো খাদে পড়ে যাচ্ছে।

– ওহ, আমার পা! ওহ, আমার হাত! – কান্নার রোল ওঠে। এমনকি একটি দুর্বল কণ্ঠ যোগ্য নেতাকে অভিশাপ দেয় কিন্তু তারপরেই চুপ হয় যায়।

যখন সূর্য উঠল, সেখানে নেতা বসে ছিলেন, যেদিন তাকে বেছে নেওয়া হয়ছিল সেদিনের মত। তাঁর চেহারায় কিছু পরিবর্তন হয়নি।

মুখপাত্র খাদ থেকে উপরে উঠে আসে, তার পিছনে আরও দুজন। আহত এবং রক্তাক্ত, আর কত জন বেঁচে আছে আছে দেখার জন্য তারা পেছন ফেরে, কিন্তু শুধু তারাই বেঁচে ছিল। তাদের হৃদয় হতাশা এবং ভয় ভরে ওঠে। অঞ্চলটি অজানা, পাহাড়ি, পাথুরে – কোথাও কোনও পথ ছিল না। দুদিন আগ তারা একটি রাস্তা দেখতে পেরেছিল কিন্ত তারা সেটি ছেড়ে আসে। নেতা তাদের এই পথে নিয়ে আসে।

তারা এই দুর্দান্ত ভ্রমণে মারা যাওয়া অনেক বন্ধুবান্ধব এবং আত্মীয়স্বজন সম্পর্কে ভেবেছিল। তাদের পঙ্গু অঙ্গগুলির ব্যথার চেয়ে শক্তিশালী এক দুঃখ তাদেরকে পরাভূত করে। তারা নিজের চোখে নিজের ধ্বংস দেখেছে।

মুখপাত্র নেতার কাছে গেলেন এবং ব্যথা, হতাশা এবং ভীত কণ্ঠে কথা বলতে শুরু করলেন।

– আমরা এখন কোথায় যাচ্ছি?

নেতা নিরব ছিলেন।

– আপনি আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন এবং কোথায় নিয়ে এসেছেন? আমরা নিজেদের এবং আমাদের পরিবারগুলিকে আপনার হাতে তুলে দিয়েছিলাম এবং আমরা আপনাকে অনুসরণ করেছি আমাদের বাড়ি এবং পূর্বপুরুষদের কবর পিছনে ফেলে রেখে এই আশায় যে আমরা সেই অনুর্বর ভূমিতে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচতে পারব। কিন্তু আপনি আমাদের আরও খারাপভাবে ধ্বংস করেছেন। আপনার পিছনে দু’শ পরিবার ছিল এবং এখন দেখুন কতজন আছে!

– আপনার মানে সবাই এখানে নেই? – নেতা মাথা না তুলে নিচু গলায় বলেন।

– আপনি কিভাবে এই ধরনের প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে পারেন? তাকিয়ে দেখুন! দুর্ভাগ্যজনক এই যাত্রায় আমাদের মধ্যে কত জন রয়ে গেছে তা গণনা করুন! দেখুন আমাদের কি অবস্থা! এভাবে পঙ্গু হওয়ার চেয়ে মরে যাওয়া ভাল ছিল।

– আমি আপনাদের দেখতে পাব না!

– কেন?

– আমি অন্ধ।

সম্পূর্ণ নিরবতা।

– ভ্রমণের সময় আপনি কি আপনার দৃষ্টি হারিয়েছেন?

– আমি জন্ম অন্ধ!

তিনজন হতাশায় মাথা নিচু করে।

শরৎ কালের বাতাস পাহাড়ের মধ্য দিয়ে একটি শুকনো পাতা উড়িয়ে নিয়ে আসে। কুয়াশা পাহাড় ঢেকে ফেলে, ঠাণ্ডা, ভিজে হওয়ায় একটি কাক উড়তে থাকে। একটি অশুভ শঙ্কেতে চারিদিক ভরে ওঠে। সূর্য মেঘের আড়ালে লুকিয়ে ছিল, যা আরও দূরে এবং দ্রুত বয়ে যাচ্ছিল।

তিনজন একে অপরের দিকে ভীতির সাথে তাকায়।

– আমরা এখন কোথায় যাব? – একজন হতাশ স্বরে বলেন।

– আমরা জানি না!

 

বেলগ্রেডে, 1901।
রাদ্বয়ে ডোমানোভিচ” প্রকল্পটির জন্য অনুবাদ করেছেন মৈত্রেয়ী মন্ডল, 2020।

নেতা (2/3)

(আগের পৃষ্ঠা)

পরদিন যে দীর্ঘ যাত্রা করার সাহস যাদের ছিল তারা সবাই একত্রিত হয়। দুই শতাধিক পরিবার নিযুক্ত স্থানে আসেন। পুরাতন বাস ভূমি দেখাশোনা করার জন্য কেবল কয়েকজন রয়ে যায়।

এই দুর্দশাগ্রস্ত মানুষদের দুর্ভাগ্যের কারণে বাধ্য হয়ে নিজেদের জন্মস্থান, যেখানে তাদের পূর্বপুরুষদের কবর দেওয়া হয়ছে সেই জায়েগা ছেড়ে যেতে দেখা সত্যই দুঃখের বিষয় ছিল। তাদের মুখগুলি ক্লান্ত, জরাজীর্ণ এবং রোদে পোড়া ছিল। দীর্ঘ বহু বছরের কঠোর পরিশ্রমের প্রভাব তাদের চেহারায় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল, তাদের চেহারায় শুধুই ক্লান্তি ও হতাশা দেখা যাচ্ছিল। তবে এই মুহুর্তে আশার প্রথম ঝলক দেখা গিয়েছিল – তবে অবশ্যই তার সাথে মিশে ছিল বাড়ি ছাড়ার বিষন্নতা। অনেক বৃদ্ধের চোখ দিয়ে জল ঝড়ছিল, তাঁরা নিরাশা হয় দীর্ঘশ্বাস ফেলছিলেন এবং আরো দুর্ভোগের আশংকায় মাথা নাড়ছিলেন। তাঁর ইচ্ছা ছিল আর কিছু দিন থেকে যাওয়ার যাতে তিনিও এই পাথরের মধ্যে দেহ ত্যাগ করতে পারেন আরও ভালো বাস ভূমি সন্ধান করার পরিবর্তে। অনেক মহিলা উচ্চস্বরে শোক প্রকাশ করে নিজেদের পরিজনদের বিদায় জানালেন যাদের কবর তারা পিছনে ফেলে যাচ্ছে।

পরুষের দেখাতে চাইছিল তারা খুব সাহসী তাই তারা চিৎকার করছিল, – আচ্ছা, তাদলে কি আপনারা এই খারাপ জায়াগায় ঝুপড়িতে বাস করা অনাহারে দিন কাটাতে চান? – প্রকৃতপক্ষে যদি সম্ভব হত তবে তারা নিজেদের সাথ ইচ্ছা ছিল পুরো অঞ্চলটা নিজেদের সাথে নিয়ে যায়।

সাধারণত মানুষের ভিড়ে যেমন আওয়াজ হয় সেই রকম আয়জায় ও চিৎকার শোনা যাচ্ছিল। নারী পুরুষ সবাই অস্থির ছিল। বাচ্চারা তাদের মায়ের কোলে চেচামেচি করছিল। এমনকি পশুরাও কিছুটা অস্বস্তিতে ছিল। বেশি গরু ছিলনা, এদিক ওদিকে একটা দুটো হাড় জীর্ণ বাছুরও ছিল, এবং ছিল একটা বড় মাথা মোটা পা কিন্তু রোগা শরীর ঘোড়া, পিঠে তার পুরনো কম্বল, ব্যাগ আর জিনের উপর দুটো ভর্তি বস্তা, ওজনের চাপে বেচারা জন্তুটি দুলছিল। তুবও সেটা কোনো ভাবে দাঁড়িয়ে থাকে এবং মাঝে মাঝে ডাক ছারে। অন্যরা গাধার পিঠে জিনিস রাখছিল; এবং বাছারা কুকুরের গলার দড়ি ধরে টানছিল। কথা বলা, চিৎকার, চেঁচামেচি, গালাগালি, কান্না, কুকুরের ডাক, ঘোড়ার ডাক – সব কিছুই একটু বেশি মাত্রায় হচ্ছিল। এমন কি একটা গাধাও কয়েক বার ডেকে ওঠে। কিন্তু নেতা একটা কোথাও বলে না, যেন পুরো ব্যাপারটার সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই। একজন সত্যিকারের জ্ঞানী ব্যক্তি!

তিনি কেবল মাথা নিচু করে নিরবে বসে থাকেন। কখনো কখনো থুথু ফেলেন, আর কিছু না। কিন্তু তাঁর এই অদ্ভূত আচরণের কারণে তাঁর জনপ্রিয়তা এতটাই বেড়েছিল যে তাঁর আজ্ঞা অনুসারে সবাই আগুনে বা জলে ঝাঁপ দিতেও রাজি ছিল, যেমন তারা বলেছিল।

– এমন কাউকে খুঁজে পেয়ে আমাদের খুশি হওয়া উচিত। ঈশ্বর জানেন কি হত যদি আমরা তাঁকে সাথে না নিতাম! আমরা মারা পরতাম। আমি আপনাকে বলছ এনি সত্যিকারার বুদ্ধিমান! তিনি চুপ করে আছেন। তিনি এখনও পর্যন্ত একটি কোথাও বলেননি! – একজন শ্রদ্ধা ও গর্বের সাথে জেতার দিকে তাকিয়ে বলে।

– তিনি কি বলবেন? যারা বেশি কথা বলেন তারা খুব বেশি চিন্তা করেন না। উনি নিশ্চই খুব বুদ্ধিমান! তিনি কেবল চিন্তা-ভাবনা করেন এবং কিছুই বলেন না – আরো একজন বলেন, এবং তিনিও বিস্ময়ের সাথে নেতার দিকে তাকান।

– এত লোকের নেতৃত্ব করা সহজ নয়!  তাঁকে অনেক চিন্তাভাবনা করতে হবে কারণ তিনি অনেক বড় দায়িত্ব নিয়েছেন, – প্রথম ব্যক্তি অবার বলেন।

যাত্রা শুরু করার সময় হয়। তারা সবই কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেন, দেখার জন্য আর কেউ মত পাল্টে তাদের সাথে যেতে রাজি আছে কিনা, আর কেউ আসে না তাই আর তাদের সেখানে অপেক্ষা করা চলে না।

– আমাদের কি যাওয়া উচিত নয়? – তারা নেতা কে জিজ্ঞাসা করে।

নেতা কোনো কথা না বলে ওঠে দাঁড়ায়।

বিপদ বা জরুরী পরিস্থিতিতে নেতার পাশে থাকার জন্য সবচেয়ে সাহসী পুরুষরা নেতার চারপাশে দলবদ্ধ হয়।

নেতা, চেহারায় বিরক্তি নিয়ে, মাথা নিচু করে কয়েক ধাপ হাঁটেন সম্মানজনকভাবে নিজের সামনে নিজের বেত দোলাতে দোলাতে। সমাবেশটি তার পিছনে পিছনে চলতে থাকে এবং একাধিকবার চেঁচিয়ে ওঠে, “আমাদের নেতা দীর্ঘ জীবী হোক!” তিনি আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে গ্রামের হল ঘরের সামনের বেড়াতে ধাক্কা খান। সেখানে স্বাভাবিকভাবেই তিনি থামলেন; সুতরাং দলটিও থেকে যায়। তারপর নেতা খানিকটা পিছনে গিয়ে বেড়ার ওপর নিজের লাঠি দিয়ে কয়েকবার আঘাত করেন।

– আপনি আমাদের কি করতে আজ্ঞা করেন? – তারা জিজ্ঞাসা করে।

তিনি কিছুই বললেন না।

– আমাদের কি করা উচিৎ? বেড়া ভেঙে ফেলো! আমাদের এটাই করা উচিত! দেখতে পাচ্ছেন না উনি নিজের লাঠি দিয়ে আমাদের সেই রকমই নির্দেশ দিচ্ছেন? – যারা নেতার চারপাশে দাঁড়িয়েছিল তারা চিৎকার করে বলে উঠে।

– ঐ যে ফটক! ঐ যে ফটক! – বাচ্চারা চিৎকার করে তাদের অল্ট দিকের ফটকের দিকে আঙুল তুলে দেখায়।

– চুপ কর, বাচ্চারা!

– ঈশ্বর আমাদের সাহায্য করুন, কি যে হচ্ছে? – কয়েক জন মহিলা চিন্তিত হয় বলেন।

– কেউ কিছু বলবেন না! উনি জানেন আমাদের কি করা উচিত! বেড়া ভেঙে ফেলা হোক!

এক মুহুর্তে বেড়া ভেঙে ফেলা হল যেন সেখানে কখনও কোনো বেড়া ছিলই না।

তারা বেড়া ছাড়িয়ে এগিয়ে যায়।

বড়জোর তারা একশো ধাপ এগিয়ে ছিল নেতা একটা কাঁটা ঝোপে ধাক্কা খেয়ে থেমে যান। অনেক চেষ্ট করে তিনি ঝোপ থেকে বেরিয়ে আসেন ও নিজের লাঠি দিয়ে নিজের চারপাশের মাঠি ঠুকতে শুরুর করেন। কেউ এগিয়ে যায় না।

– এবার কি হল? – পিছনে যারা ছিল তারা চিৎকার করে জিজ্ঞাসা করে।

– কাঁটা ঝোপ কেটে ফেলো! – নেতার চারপাশে যারা দাঁড়িয়ে ছিল তারা বলে ওঠে।

– ওই যে রাস্তা, ঝোপের পিছনে! ওই কে দেখা যাচ্ছে! – বাচ্চারা এবং পিছন দিকে অনেক লোক চিৎকার করে ওঠে।

– ওই যে রাস্তা! ওই যে রাস্তা! – নেতার আশেপাশের লোকের ঠাট্টা-বিদ্রূপের স্বরে বলে ওঠে। – আমরা অন্ধ লোকেরে কিভাবে জানবো উনি আমাদের পথ দেখিয়ে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন? সবাই আজ্ঞা দিতে পারে না। নেতা সবচেয়ে ভাল এবং সোজা রাস্তা চেনেন। কাঁটা ঝোপ কেটে ফেলো!

সবাই রাস্তা পরিস্কার করতে ঝাঁপিয়ে পরে।

– আহ, -যার হাতে কাঁটা ফুটেছিল সে চেঁচিয়ে ওঠে তার সাথে যার মুখে ব্ল্যাকবেরি ডালের কাঁটা ফোটে সেও কঁকিয়ে ওঠে।

– ভাইয়েরা, তোমরা কিছু না হারিয়ে কিছু পেতে পারনা। সাফল্য অর্জনের জন্য তোমাদের কষ্ট করতে হবে, – উত্তর দেয় দলের সব থেকে সাহসী ব্যক্তি।

তারা অনেক কষ্টে ঝোপ ভেঙে এগিয়ে চলে।

আরও কিছুদূর ঘোরাফেরা করার পরে, তারা একগুচ্ছ লগির সাথে সাথে ধাক্কা খায়। এগুলোকে ও সরানো হয়। তারপর তারা অবার পথ চলতে থাকে।

প্রথম দিন খুব সামান্য পথ চলা হয় কারণ তাদের অনেকগুলি একই রকম বাধা অতিক্রম করতে হয়। তাদের খাছে খাবার সল্প পরিমাণে ছিল কারণ কিছি লোক সঙ্গে শুধু কিছু শুকনো রুটি আর চিজ এনেছিল, অন্যদের কাছে শুধুই সামান্য রুটি ছিল। কিছুই লোকের কাছে কোনো খাবারই ছিল না। ভাগ্যক্রমে গ্রীষ্মের সময় ছিল তাই তারা এখানে সেখানে একটা দুটো ফলের গাছ পেয়েছিল।

সুতরাং, যদিও প্রথম দিনে তারা খুবই কম দুরুত্ব পিছনে ছেড়ে আসতে পেরেছিল তবুও তারা তারা খুব ক্লান্ত বোধ করেছিল। কোনও বড় বিপদ বা  কোনও দুর্ঘটনাও ঘটেনি। স্বাভাবিকভাবেই এত বড় একটি উদ্যোগের ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত ঘটনাগুলিকে অবশ্যই সামান্য হিসাবে বিবেচনা করা উচিত: একজন মহিলার চোখে কাঁটা ফুটে যায়, তিনি সেটা এন্টি ভিজে কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখানে; একটি বাচ্চা কাঁদতে কাঁদতে লগির সাথে ধাক্কা খায়; একজন বয়স্ক ভদ্রলোকের পা মচকে যায় ব্ল্যাকবেরি ঝোপের উপর পরে গিয়ে; ব্যথার জায়গায় পিয়াজ লাগানোর পরে কোনো রকমে ব্যাথা সহ্য করে লাঠির ওপর ভোর করে হাঁটতে থাকেন বীরের মত নেতার পিছনে পিছনে। (নিশ্চিতভাবেই, বেশ কয়েকজন বলেছিলেন যে বয়স্ক লোকটি গোড়ালি সম্পর্কে মিথ্যা কথা বলছিল এবং তিনি কেবল ভান করছিলেন কারণ তিনি ফিরে যেতে ব্যাকুল ছিলেন।) শীঘ্রই, খুব কম লোকই ছিল যাদের হাতে কাঁটা ফুটে যায়নি অথবা মুখে আঁচর লাগেনি। পুরুষরা সমস্ত বীরত্বপূর্ণভাবে সহ্য করেছিল, কিন্তু মহিলারা যাত্রা শুরুর সময়টা কে অভিশাপ দিচ্ছিল এবং শিশুরা স্বাভাবিকভাবেই চিৎকার করে কান্নাকাটি করছিল কারণ তারা বুঝতে পারছিল না এই সমস্ত পরিশ্রমের পরিণাম সুখের হবে।

সবাই খুশি এবং আনন্দিত ছিল যে নেতার কিছুই ঘটেনি। সত্য কথা বলতে গেলে, তাঁকে অনেক সুরক্ষায় রাখা হয়ছিল কিন্তু তবুও লোকটি ভাগ্যবান ছিল। প্রথম রাতের শিবিরের জায়গাতে সকলেই ঈশ্বরের প্রার্থনা করেন এবং তাঁকে ধন্যবাদ জানায়, যে সে দিনের যাত্রা সফল হয়ছে এবং নেতার কোনো ক্ষতি হয়নি। তারপরে একজন সাহসী ব্যক্তি কথা বলতে শুরু করে। তার মুখে ব্ল্যাকবেরি ঝোপের আঁচর লেগেছিল। কিন্তু সেদিকে তার কোনো খেয়াল ছিল না।

– ভাইয়েরা, – তিনি বলতে শুরু করেন। – প্রথম দিনের যাত্রা আমরা পিছনে ফেলে এসেছি তাই আমাদের ঈশ্বর কে ধন্যবাদ জানানো উচিত। পথ সহজ নয়, তবুও আমাদের চলতে হবে কারণ আমরা সবাই জানি যে এই কঠিন রাস্তাটি আমাদের সুখের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সর্বশক্তিমান ঈশ্বর আমাদের নেতা কে যে কোনো রকম ক্ষতি থেকে রক্ষা করুন যাতে তিনি আমাদের সফলভাবে নেতৃত্ব দিয়ে যেতে পারেন।

– আজকের মতো ঘটনা ঘটলে কাল আমি আমার অন্য চোখটাও হারাব! – একজন মহিলা ক্রোধের সাথে বললেন।

– ওহ, আমার পা! – মহিলার মন্তব্যের দ্বারা উৎসাহিত হয় একজন বয়স্ক লোক বলেন।

শিশুরা কেঁদে চলে, যাতে মুখপাত্রের কথা শোনা যায় তাই বাচ্চাদের চুপ করাতে মায়েদের অনেক কষ্ট করতে হয়।

– হ্যাঁ, আপনি আপনার অন্য চোখটি হারাবেন – তিনি ক্রোধে ফেটে পরে বলেন – এবং আপনি দুটোই হারাতে পারেন! এত বড় উদ্যোগের জন্য একজন জন মহিলার চোখ হারানো কোনও বড় দুর্ভাগ্যের বিষয় নয়। আপনার লজ্জা হওয়া উচিত! আপনি কি আপনার সন্তানদের ভালো ভবিষ্যতের কথা ভাবছেন না? আসুন আমাদের মধ্য থেকে অর্ধেক জন এই উদ্যোগের জন্য প্রাণ ডান করি! তাতে কি পার্থক্য় হবে? একটা চোখের কি মূল্য আছে? আপনার একটা চোখের কি প্রয়োজন যখন একজন আমাদের পথ দেখিয়ে সুখের দিকে নিয়ে যাচ্ছে? কেবলমাত্র আপনার চোখ এবং একজন বৃদ্ধের একটি পায়ের কারণে কি আমরা এই উদ্যোগ ছেড়ে চলে যাব?

– উনি মিথ্যা কথা বলছেন! বয়স্ক লোকটি মিথ্যা কথা বলছেন! অনি কেবল ভান করছেন যাতে তিনি ফিরে যেতে পারেন, – চারদিক থেকে সবাই বলে ওঠে।

– ভাইয়েরা, যারা আর দুরু যেতে চায় না , – বক্তা আবার বলেন , – তাদের অভিযোগ করে আমাদের উৎপীরিত করার পরিবর্তে ফিরে যাওয়া উচিত। যতদূর আমি জানি, আ,আমার যতক্ষণ জীবন থাকবে আমি এই বিজ্ঞ নেতার কে অনুসরণ করে যাব!

– আমরা সবাই অনুসরণ করব! আমরা যতক্ষণ বেঁচে থাকব আমরা সকলেই তাঁকে অনুসরণ করব!

নেতা নিরব ছিলেন।

সবাই তাঁর দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলতে শুরু করল:

– নেতা চিন্তায় মগ্ন!

– জ্ঞানী মানুষ!

– তাঁর কপালের দিকে তাকান!

– সর্বদা ভ্রুকুটি তাঁর মুখে!

– গম্ভীর!

– তিনি সাহসী! তাঁর সব আচরণ দেখেই তা বোঝা যায়।

– আপনি আবারও তা বলতে পারেন! বেড়া, লগি, ঝোপঝাড় – তিনি সব কিছুই চষে ফেলেন। তিনি কোনো কথা না বলে গম্ভীরভাবে মাটিতে নিজের লাঠি ঠুকতে থাকেন এবং তিনি কি ভাবছেন আপনাকে অনুমান  করতে হবে।

(পরের পৃষ্ঠা)

নেতা (1/3)

– ভাইয়েরা ও বন্ধুরা, আমি আপনার সমস্ত বক্তৃতা শুনেছি, তাই এখন আমি আপনাদের অনুরোধ করছি আমার কথা শোনার জন্য। যতক্ষণ আমরা এই অনুর্বর অঞ্চলে রয়েছি আমাদের সমস্ত আলোচনা ও কথোপকথনের কোনও মূল্য নেই। এই বালুকাময় পাথুরে মাটিতে এখনও পর্যন্ত কিছুই বাড়তে পারেনি, এই খরার কথা ছেড়েই দিন, আমরা এর আগে এই রকম খরা আর কখনও দেখিনি। আর কতদিন আমরা এভাবে একত্রিত হয়ে বৃথা বাক্য ব্যয় করব? গবাদি পশু না খেতে পেয়ে মরে যাচ্ছে, এবং খুব শীঘ্রই আমরা এবং আমাদের বাচ্চারাও অনাহার মারা পরব। আমাদের অন্য কোনো ভালো ও যুক্তিসম্মত সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। আমার মনে হয় আমাদের এই  অনুর্বর জায়গা ছেড়ে ভাল এবং ঊর্বর কোনো জায়গার সন্ধান করা উচিত কারণ এইভাবে আর বাঁচা যাবে না।

একটি সভায় ক্লান্ত কণ্ঠে কোনো অনুর্বর প্রদেশের বাসিন্দা কখনও এমনটি বলেছিল। আমার মনে হয় কখন এবং কোথায় সে এমন বলেছিল তা আমার ও তোমার জানার প্রয়োজন নেই। আমার ওপর বিশ্বাস রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে অনেক আগে কোনো জায়গায় এমনটি ঘটেছিল এবং এটাই যথেষ্ট। সত্যি কথা বলতে, এক সময় আমি মনে করতাম এই পুরো গল্পটি আমি কোনোভাবে রচনা করেছি কিন্তু ধীরে ধীরে আমার এই ভ্রম থেকে আমি নিজেকে মুক্ত করি। এখন আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে আমি সত্যিই যা ঘটেছিল তা অবশ্যই উল্লেখ করতে যাচ্ছি এবং অবশ্যই কোথাও না কোথাও এমন ঘটনা ঘটেছিল আর এটা আমি বানিয়ে বানিয়ে বলছি না।

ফ্যাকাসে, ক্লান্ত এবং অভিব্যক্তিহীন মুখ, বিষন্ন, লক্ষ্যহীন দৃষ্টি বেল্টের নিচে হাথ রাখা এই মানুষগুলি যেন এই যুক্তিপূর্ণ কথাগুলি শুনে সম্বিত ফিরে পায়। প্রত্যেকে ইতিমধ্যে কল্পনা করছিল তারা কোনো জাদুকরি, স্বর্গিয়ে জগতে বসবাস করে যেখানে তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফল স্বরূপ তারা সমৃদ্ধ লাভ করতে পারবে।

– ঠিক কথা! ঠিক কথা! – চারিপাশের ক্লান্তি কণ্ঠস্বর ফিসফিস করে বলে উঠল।

– এই জায়গাটি কি কাছাকাছি কোথাও আ-ছে? – কোণের দিক থেকে একটি কন্ঠস্বর ধীর গতিতে বলে উঠল।

– ভাইয়েরা! – অন্য একজন আরো একটু দৃঢ় কণ্ঠে বলতে শুরু করে। – আমাদের অবশ্যই এই পরামর্শটি অবিলম্বে অনুসরণ করতে হবে কারণ আমরা আর এইভাবে জীবনযাপন করতে পারব না। আমরা অনেক পরিশ্রম করেছি অনেক কষ্ট ভোগ করেছি কিন্তু সব বৃথা গিয়েছে। আমরা বীজ বপন করেছি যা আমরা খাদ্য় হিসাবে খেতে পারতাম, বন্যা এসে ঢাল থেকে সেই সমস্ত বীজ মাটি সমেত ধুয়ে নিয়ে গেছে, শুধু পাথর রয়ে গেছে। আমাদের কি চিরকাল এখানে থাকতে হবে, ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত, নগ্ন, খালি পায়ে সকাল থেকে রাত অবধি পরিশ্রম করা সত্তেও? আমাদের অন্য কোথাও ঊর্বর মাটির সন্ধানে যাওয়া উচিৎ যেখানে আমাদের কঠোর পরিশ্রমের ফলে ফসল ফলবে।

– চলো যাওয়া যাক! এখুনি যাওয়া যাক কারণ এই জায়গাটা আর বসবাসের যোগ্য নয়।

ফিসফিস আওয়াজ উঠতে থাকে, এবং প্রত্যেকে হাঁটতে শুরু করে, কেউ ভাবেনা তারা কোথায় চলেছে।

– দাঁড়াও ভাইয়েরা! কোথায় যাচ্ছেন? – প্রথম বক্তা অবার বলে ওঠে। – অবশ্যই আমাদের যেতে হবে, তবে এভাবে নয়। আমরা কোথায় যাচ্ছি তা জানতে হবে। অন্যথায় আমরা নিজেদের বাঁচানোর পরিবর্তে আরও খারাপ পরিস্থিতিতে গিয়ে পরব। আমার প্রস্তাব আমাদের এমন একজন নেতা কে বেছে নেওয়া উচিত যাঁকে আমরা সবাই মেনে চলব ও যে আমাদের সবথেকে ভালো পথ দেখাবেন।

– আসুন নির্বাচন করুন! আসুন এখনই কাউকে বেছে নেওয়া যাক – চারিদিক থেকে শোনা গেল।

কিন্তু তখনই তর্ক শুরু হয়, সত্যিকারের বিশৃঙ্খলা। প্রত্যেকে কথা বলছিল, কেউ শুনছিল না, শুনতে পাচ্ছিলও না। তারা আলাদা আলদা দলে বিভক্ত হতে শুরু করে, প্রতিটি ব্যক্তি নিজেই বিড়বিড় করতে শুরু করে, আর তারপর সেই দলগুলিও ভেঙে যায়। দু’জন দু’জনে করে একে ওপরের হাত ধরে কথা বলতে শুরু করে প্রতেকেই কিছু প্রমাণ করতে চেষ্টা করে, একে অপরের হাতা ধরে টানাটানি শুরু করে, এবং অন্যকে হাত দেখিয়ে চুপ করাতে চেষ্টা করে। তারপরে তারা সকলে আবার একত্র হয়ে, কিন্তু তবুও কথা বলে চলে।

– ভাইয়েরা! – হঠাৎ করেই একটি শক্তিশালী কণ্ঠস্বর শোনা যায় যা অন্য সব কোলাহল বন্ধ করে দেয়। – এইভাবে আমরা কোনো মীমাংসায় পৌঁছাতে পারব না। প্রত্যেকে কথা বলছে এবং কেউ শুনছে না। আসুন একজন নেতা কে বেছে নেওয়া যাক! আমাদের মধ্যে থেকে কাকে বেছে নেওয়া যায়? আমাদের মধ্যে কে রাস্তাগুলি জানার মত যথেষ্ট ভ্রমণ করেছেন? আমরা সবাই একে অপরকে ভালো করে জানি, এবং তবুও আমি নিজে কে এবং আমার সন্তানদের এখানে হাজির কোনো ব্যক্তির নেতৃত্বের অধীন করতে চাই না। বরং আমাকে বলুন যে কে ওই ভ্রমণকারী যে সকাল থেকে ওই রাস্তার ধারে ছায়ায় বসে আছে?

সবাই চুপ হয়ে যায়। সকলেই অপরিচিত ব্যক্তির দিকে ঘুরে দাঁড়ায় এবং তার মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখতে থাকে।

মধ্যবয়সী ভ্রমণকারীর মলিন মুখ প্রায় দেখা যাচ্ছিল না লম্বা দাড়ি ও চুলের আড়ালে, আগের মতোই সেখানে চুপ করে বসে থাকেন, চিন্তায় আছন্ন মাঝে মাখে হাতের লম্বা লাঠি মাটিতে ঠুকতে থাকেন।

– গতকাল আমি ওই লোকটিকে একটি ছোট ছেলের সাথে দেখেছি। তারা দুজনে হাত ধরে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। এবং গত রাতে ছেলেটি গ্রাম ছেড়ে চলে যায় কিন্তু এই অপরিচিত লোকটি এখানেই থাকে যান।

– ভাইয়েরা, আসুন আমরা এই যুক্তিহীন তর্ক ভুলে যাই যাতে আর সময় নষ্ট না হয়। ওই ব্যক্তি যেই হোক না কেন, তিনি অনেক দূর থেকে এসেছেন তাই আমরা কেউ থাকে চিনি না এবং আমাদের নেতৃত্ব দেওয়ার সবচেয়ে কম দূরত্বের এবং সর্বোত্তম পথ নিশ্চই তাঁর জানা। আমার বিচারে তিনি একজন অত্যন্ত জ্ঞানী ব্যক্তি কারণ তিনি ওখানে চুপচাপ বসে চিন্তা করছেন। অন্য যে কেউ ইতিমধ্যে দশ বার আমাদের বিষয় নাক গলাতে আসত এবং কথোপকথন শুরু করে দিত আমারদের মধ্যে কারুর সাথে কিন্তু সে সারাক্ষণ ওইখানে চুপচাপ বসে আছেন কিছুই বলছেন না।

– অবশ্যই লোকটি চুপ করে বসে আছেন করুন তিনি কোনো ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করছেন। অন্যথায় আর কিছু নয়, তিনি খুবই বুদ্ধিমান – সবাই একমত হলেন এবং একসাথে অবার অপরিচিত ব্যক্তিটি কে নিরীক্ষণ করতে শুরু করলেন। প্রত্যেকেই তাঁর মধ্যে একটি উজ্জ্বল বৈশিষ্ট্য আবিষ্কার করেছিলেন, যা তাঁর অসাধারণ বুদ্ধির প্রমাণ।

তাঁরা আর কথা বলায় বেশি সময় ব্যয় করলেন না, সুতরাং অবশেষে সকলেই একমত হলেন যে ভ্রমণকারীকে জিজ্ঞাসা করাই ভাল হবে – যাঁকে, তারা ভাবছিলেন ঈশর এই ব্যক্তিটি কে তাঁদের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছেন তাঁদের পথ দেখিয়ে অন্য কোনো ঊর্বর ভালো জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্য। এই ব্যক্তিরই তাদের নেতা হওয়া উচিত এবং তারা এঁর কথা শুনবেন কোনো প্রশ্ন না করে।

তারা নিজের মধ্য থেকে দশ জন কে বেছে নেয় তাদের সিদ্ধান্ত অপরিচিত ব্যক্তির কাছে গিয়ে ব্যাখা করবার জন্য। এই প্রতিনিধিদলটি ওপর দ্বায়িত্ব ছিল অপরিচিত ব্যক্তি কে তাদের শোচনীয় পরিস্থিতিরে কথা বলা ও তাঁকে তাদের নেতা হওয়ার অনুরোধ করার।

দশজন গিয়ে নম্রভাবে মাথা নত করল। তাদের মধ্যে একজন এই অঞ্চলের অনুৎপাদনশীল মাটি সম্পর্কে, খরার সময়ের কথা এবং তাদের দুর্দশার কথা বলতে শুরু করে। তিনি তাঁর বক্তব্য নিম্নলিখিত পদ্ধতিতে শেষ করেন:

– এই পরিস্থিতি আমাদের বাধ্য করছে আমাদের বাড়িঘর এবং জমি ছেড়ে চলে যেতে আরো ভালো বাস উপযুক্ত স্থানের সন্ধানে। যে মুহুর্তে আমরা এই সিদ্ধান্ত পৌছাই, যেন ঈশ্বর আমাদের ওপর করুনাময় হয় আপনাকে আমাদের কাছে পাঠিয়ে দেন – আপনি একজন জ্ঞানী ও যোগ্য অপরিচিত – এবং আপনি আমাদের নেতৃত্ব দেবেন এবং আমাদের দুর্দশা থেকে মুক্ত করবেন। এখানকার সমস্ত বাসিন্দাদের হয় আমরা আপনাকে আমাদের নেতা হতে অনুরোধ করছি। আপনি যেখানেই যাবেন, আমরা আপনাকে অনুসরণ করব। আপনি রাস্তা চেনেন এবং অবশ্যই আপনি কোনো সুখের ও ভালো স্থানে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। আমরা আপনার কথা শুনব এবং আপনার প্রতিটি আদেশ পালন করব। হে, বিজ্ঞ অচেনা মানুষ আপনি কি এতগুলি প্রাণকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে রাজি হবেন? আপনি কি আমাদের নেতা হবেন?

এই অনুনয় পূর্ণ বক্তৃতা চলাকালীন সেই জ্ঞানী অপরিচিত ব্যক্তি একবারও মাথা তোলেন না। পুরো সময় তিনি সেই একই অবস্থানে থেকেন যেভাবে তাঁরা তাঁকে প্রথমে দেখতে পেয়েছিল। তাঁর মাথা নীচু, চেহারায় ভ্রূকুটি, কোনো কথা বলেন না। কিছু সময় অন্তর হাতের লাঠি দিয়ে মাটি ঠুকতে থাকেন এবং – চিন্তা করতে থাকেন। বক্তৃতা শেষ হওয়ার পরে নিজের অবস্থান না বদলে তিনি ধীরে এবং রূঢ়হ ভাবে বিরিবির করে বলেন:

– আমি করব!

– আমরা কি তাহলে আপনার সাথে যেতে পারি এবং আরও ভাল জায়গার সন্ধান করতে পারি?

– পারেন! – তিনি মাথা না তুলে বলে যান।

সবার মুখে উৎসাহ এবং প্রশংসা ফুটে ওঠে, কিন্তু অপরিচিত ব্যক্তিটি তা দেখেও একটি শব্দ বলেন না।

দশজন সমবেত বাকি সবাই কে গিয়ে তাদের সাফল্যের কথা জানায়, এবং এও বলে তারা এখন বুঝতে পেরেছে এই ব্যক্তি বিপুল জ্ঞানের  ভান্ডারের অধিকারী।

– তিনি ঘটনাস্থল থেকে সরে যাননি করা তাঁর সাথে কথা বলছে দেখার জন্য মাথাও তোলেননি। তিনি কেবল চুপচাপ বসে ধ্যান করতে থাকেন। আমাদের সমস্ত আলোচনা এবং প্রশংসার উত্তরে তিনি কেবল চারটি কথা বলেন।

– সত্যিকারের একজন ঋষি! বিরল বুদ্ধিসম্পন্ন! – চারিদিক থেকে তাঁরা আনন্দে চিৎকার করে বলে ওঠেন স্বর্গ থেকে ঈশ্বর নিজেই একজন ফেরেশতা পাঠিয়ে দিয়েছেন তাদের বাঁচানোর জন্য। সকলেই এমন নেতার নেতৃত্বের অধীনে সাফল্যের দৃঢ় প্রত্যয়ী ছিলেন, যাকে বিশ্বের কোনও কিছুই হতাশ করতে পারে না। এবং তাই পরের দিন ভোরবেলায় যাত্রা শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

(পরের পৃষ্ঠা)